থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিরাপদ রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক সেমিনার ও রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করেছে ইউএস-বাংলা গ্রুপ।
আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস উপলক্ষ্যে রোববার (১৪ জুন) রাজধানীর উত্তরায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের করপোরেট কার্যালয়ে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিয়মিত রক্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয় এবং ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রতিষ্ঠানটি।
সেমিনারে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রাজিয়া সুলতানা বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ, যেখানে শরীরে স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। ফলে রক্তকণিকা অস্বাভাবিকভাবে ভেঙে যায় এবং রোগী রক্তস্বল্পতায় ভোগে। অনেক ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন পড়ে।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলেও বাংলাদেশে এ হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক এবং প্রতিবছর প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

ডা. রাজিয়া সুলতানা বলেন, বাবা-মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে ২৫ শতাংশ। আবার ২৫ শতাংশ সন্তান সুস্থ এবং ৫০ শতাংশ বাহক হিসেবে জন্ম নিতে পারে। তবে একজন বাহক ও একজন সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে সন্তান সাধারণত থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয় না।
তিনি আরও বলেন, সাধারণত ছয় মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া মেজরের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর মধ্যে শিশুর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, খাবারে অনীহা, ঘন ঘন সংক্রমণ এবং দুর্বলতা দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে পেট ফোলা, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া এবং মুখমণ্ডলে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমে সিবিসি পরীক্ষা করা হয়। সন্দেহ থাকলে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস এবং প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। বাবা-মা উভয়েই বাহক হলে গর্ভাবস্থার ১০ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে প্রিনেটাল ডায়াগনোসিসের মাধ্যমে শিশুর অবস্থা জানা সম্ভব।
তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়ার একমাত্র নিরাময়মূলক চিকিৎসা হলো বোন ম্যারো বা স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন, যা এখনো সীমিত আকারে বাংলাদেশে পাওয়া যায়। বর্তমানে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন ও আয়রন চিলেশন থেরাপিই প্রধান চিকিৎসা। নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

সেমিনারে ইউএস-বাংলা গ্রুপের চিফ অব মেডিক্যাল সার্ভিস ডা. এস এম কাউসার নাহিদ বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে সাধারণত বিনিয়োগ ও মুনাফা গুরুত্ব পায়। তবে রক্তদান একটি মানবিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে একটি জীবন বাঁচানো সম্ভব।
তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ পরপর এক ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন হয়। একজন দাতার দেওয়া ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত একজন রোগীর জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে। নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত আয়রন কমে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে। এ কারণে তিনি কর্মীদের স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এবারই প্রথমবারের মতো রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় শুরু হওয়া এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সচেতনতামূলক সেমিনার এবং ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আরএইচটি/এমএন
