বিজ্ঞাপন

আনোয়ারায় মা-মেয়ে হত্যা : অটোরিকশার চুক্তিপত্র নিয়ে এই নৃশংসতা!

আনোয়ারায় মা-মেয়ে হত্যা : অটোরিকশার চুক্তিপত্র নিয়ে এই নৃশংসতা!

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ঘরে ঢুকে এক গৃহবধূ ও তার এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়েকে ক্রমাগত ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা পাঁচ বছর বয়সী শিশুকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যার চেষ্টা চালায় ঘাতক। 

শনিবার (১৩ জুন) রাত ১১টার দিকে উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি গ্রামে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন, ওই গ্রামের সুজন বড়ুয়ার স্ত্রী এ্যানি বড়ুয়া (৩৮) ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। প্রিয়ন্তী স্থানীয় মাহাতা পাঠনিকোটা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। এই ঘটনায় আহত পাঁচ বছরের শিশু প্রিয়াস বড়ুয়াকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সে শঙ্কামুক্ত হলেও ট্রমার মধ্যে রয়েছে।

হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত যুবকের নাম তেজপ্রিয় বড়ুয়া (৩৫)। তিনি নিহতদের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় ও একই বাড়ির বাসিন্দা। ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছে।

পুলিশ, পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতে আনুমানিক ১১টার দিকে এ্যানি বড়ুয়া ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী রান্নাঘরে রাতের খাবার তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বাড়িতে তখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্য ছিলেন না। এই সুযোগে অভিযুক্ত তেজপ্রিয় বড়ুয়া ধারালো ছুরি হাতে ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।

ঘরে ঢুকেই তিনি প্রথমে প্রিয়ন্তীর ওপর চড়াও হয় এবং তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে থাকে। মেয়ের গোঙানি ও চিৎকার শুনে মা এ্যানি বড়ুয়া বাঁচাতে এগিয়ে এলে ঘাতক তেজপ্রিয় তাকেও কুপিয়ে রক্তাক্ত করে। এরপর মায়ের কোলে থাকা পাঁচ বছরের শিশুসন্তান প্রিয়াসকে আছাড় দিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালায় ঘাতক। তাদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে প্রতিবেশীরা জড়ো হতে থাকলে অভিযুক্ত যুবক দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

নিহত এ্যানি বড়ুয়ার ভাসুরের স্ত্রী সুরভী বড়ুয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, চিৎকার শুনে আমরা দৌড়ে তাদের ঘরের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিই। এ সময় রক্তাক্ত অবস্থায় এ্যানি বড়ুয়া তার ছোট সন্তানকে বাঁচানোর জন্য কোনোমতে ভেতরের ছিটকিনি খুলে দরজা ঠেলে বের হন। তিনি তখনো নিশ্বাস নিতে নিতে হামলাকারী তেজপ্রিয়ের নাম বলছিলেন। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার আগেই বাড়ির উঠানে তার মৃত্যু হয়। আর রান্নাঘরের মেঝেতে নিথর হয়ে পড়েছিল মেয়ে প্রিয়ন্তীর রক্তস্নাত মরদেহ।

নিহতের আরেক স্বজন রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, খবর পেয়ে রাতে যখন বাড়িতে আসি, ততক্ষণে সব শেষ। আমাদের বাড়িরই ছেলে তেজপ্রিয় এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। রাতে ঘরে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকায় সুযোগটা নিয়েছে। 

পারিবারিক ও আর্থিক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে পরিবার ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। নিহত এ্যানি বড়ুয়ার স্বামী সুজন বড়ুয়া জানান, অভিযুক্ত তেজপ্রিয় বড়ুয়া বিদেশ থেকে শূন্য হাতে ফেরার পর তার কোনো চাকরি বা আয়ের উৎস ছিল না। আত্মীয়তার খাতিরে সুজন তাকে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা দিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনে দেন।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সুজন বড়ুয়া বলেন, টাকা পরিশোধের ব্যাপারে তেজপ্রিয় মাঝেমধ্যে কিছু টাকা দিত, আবার কখনো দিত না। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কখনো কোনো বড় ঝগড়াবিবাদ হয়নি। তবে রিকশা কেনার সময় আমাদের মধ্যে একটি লিখিত চুক্তিপত্র বা স্ট্যাম্প করা হয়েছিল। আমার ধারণা, ওই লিখিত কাগজটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিতেই তিনি রাতে আমাদের ঘরে ঢুকেছিল। আমার স্ত্রী-সন্তানরা বাধা দেওয়ায় তাদের এভাবে নৃশংসভাবে খুন করা হলো। আমার গোছানো সোনার সংসারটা নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। আমি এই ঘাতকের ফাঁসি চাই।

এদিকে রোববার দুপুরে সরেজমিনে চেনামতি গ্রামে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। প্রিয়ন্তীর সহপাঠী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একে একে সেখানে জড়ো হতে থাকেন। মেধাবী ছাত্রীর এমন নির্মম মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা। সহপাঠীদের কান্নায় পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অবিলম্বে হত্যাকারীকে দ্রুততম সময়ে বিচারের আওতায় এনে ফাঁসির দাবি জানান।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে আজ দুপুর দুইটার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। তিনি নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, ঘটনার বিবরণ শোনেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন।

পরিদর্শন শেষে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, নিহতদের পরিবারের তথ্য এবং আমাদের প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তেজপ্রিয় বড়ুয়া নামে ওই যুবক সরাসরি জড়িত। হামলাকারী নিহতদের পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে, পরিকল্পনা করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তেজপ্রিয়র সঙ্গে নিহত এ্যানি বড়ুয়ার স্বামী সুজন বড়ুয়ার ১ লাখ ১৭ হাজার টাকার একটি লেনদেন ছিল। মাসিক কিস্তির মাধ্যমে এসব টাকা পরিশোধের কথাও রয়েছে। এসব নিয়ে প্রথমে মেয়েকে এবং পরে মাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে হত্যা করে তেজপ্রিয়। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য জেলা পুলিশের একাধিক টিম ও ডিবি ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে। খুব দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, নিহত মা ও মেয়ের লাশ সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে এবং এই ঘটনায় আনোয়ারা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

আরএফ/এসএম