দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারকৃত দুর্নীতি মামলার আসামি, আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রোববার (১৪ জুন) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা (উপপরিচালক) মো. আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এমন তথ্য জানান।
আকতারুল বলেন, পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দুদকের মামলায় তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়েছিল। এর মধ্যে পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় তাকে দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে জেনেছি। সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোল পুলিশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। সেই ধারাবাহিকতায় আজ গ্রেপ্তার হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেওয়া হবে। শিগগিরই এমন উদ্যোগ নিয়ে ফিরিয়ে আনা হবে।
২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)।
দুদকের যে দুই মামলায় ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়
দুদকের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। বেনজীর ছাড়া বাকী আসামিরা হলেন— পাসপোর্টের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক ও বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর ডিআইজি হিসাবে কর্মরত থাকাবস্থায় হাতে লেখা পাসপোর্ট সমর্পণ করে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়া অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) এর জন্য আবেদন করেন। আবেদন ফরমে “অফিসিয়াল” হিসেবে মার্ক করা হয়। তার আবেদনপত্রের প্রফেশন এর ক্রমিকে সরকারি চাকুরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায়ও পাসপোর্টের আবেদনপত্রে জালিয়াতি-প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে “প্রাইভেট সার্ভিস” উল্লেখ করেন। অন্যান্য সময়েও বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়া মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)/ই-পাসপোর্ট (ইলেক্ট্রনিক পাসপোর্ট) এর জন্য আবেদন করেছেন। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আসামিরা বেনজীর আহমেদ-এর দাপ্তরিক পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত থেকেও অন্যান্য আসামিরা বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ সংগ্রহ না করে কিংবা যাচাই না করে স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে তার নামে সাধারণ পাসপোর্ট কিংবা ই-পাসপোর্ট ইস্যুর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দি বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ এর ১১ ধারায় অপরাধ করেছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিল দুদক। ওই মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এই মামলার বাদী দুদক উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিনের প্রেক্ষিতে আদালতের গ্রেপ্তার পরোয়ানা জারি করে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়।
দুদক সূত্রে আরও জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধানকালে বেনজীরকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেওয়া হলে তিনি, আইনজীবীর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট দুদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। সেখানে তিনি পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার তিনশ ৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ ও পাঁচ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার নয়শ ৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন। তবে তদন্তে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদ তার ঘোষণাকৃত সম্পদের মধ্যে দুই কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এবং নয় কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার সাতশ ৫১ হাজার টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বলে দুদকের কাছে প্রমাণিত হওয়া, ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সম্পদের আরও চারটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার (১৪ জুন) বিকেলে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবগত করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা কর্তৃক ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। গত ১১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে এটি পাঠানো হয়েছিল এবং আমরা বিষয়টি মনিটার করেছি। ইন্টারপোল ২০২৫/২৩৯ নম্বর ফাইল ও ৫৭৪/২০২৫ কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের প্রতি রেড নোটিশ জারি করে। ওই রেড নোটিশের মাধ্যমে ইন্টারপোল কর্তৃক সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অনুরোধ করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ, ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক রয়েছেন।
২০২০ সালে ৩০তম আইজিপি হিসেবে পুলিশ বাহিনীর প্রধান পদে দায়িত্ব নেন বেনজীর। নিয়মানুযায়ী সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু বেনজীর মর্যাদাপূর্ণ লাল পাসপোর্টও নেননি। আইজিপি হয়েও তিনি ফের বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেন। সে সময় দেশে চালু হয় ই-পাসপোর্ট। বেনজীরের আবেদন নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা। তা সমাধান করতে তিনি আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে যাননি। অসুস্থতার কথা বলে পাসপোর্টের ডিআইপির মোবাইল ইউনিট চেয়ে পাঠান। পরে পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তার বাসায় গিয়ে ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়াসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালের ৪ মার্চ তার আবেদনপত্র জমা হয়ে যায়। ওই বছরের ১ জুন বেনজীরের নামে ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
আরএম/জেআই
