বিজ্ঞাপন

এনসিটির ‘মধু খেতে’ মরিয়া সবাই

এনসিটির ‘মধু খেতে’ মরিয়া সবাই

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। বর্তমানে এটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নৌবাহিনীর ড্রাইডক। তাদের অধীনে এ টার্মিনাল ভালোভাবেই চলছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন। তারপরও এই টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। 

কিন্তু সব ভালোভাবে চললে আবার কেন দেশি-বিদেশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে এটি পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা চলছে? এমন প্রশ্নের জবাবে নাসির উদ্দিনের জবাব— এটা বন্দর কর্তৃপক্ষের বিষয় না। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় যেভাবে নির্দেশনা দেবে, আমরা সেভাবেই কাজ করব। 

নৌবাহিনীর ড্রাইডকের নেতৃত্বে সবশেষ মে মাসেও রেকর্ড পরিমাণ মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয় বলে জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। নৌবাহিনীর চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, এনসিটি পরিচালনায় তাদের কোনো জটিলতা হচ্ছে কি না? কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না? এটি তারা দীর্ঘসময় ধরে পরিচালনায় অনাগ্রহী কি না? 

জবাবে নৌবাহিনীর ওই কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ড্রাইডক নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা পরিচালনা করেন। সরকার যতদিন চায়, এনসিটি ড্রাইডক পরিচালনা করবে। এখানে লাভ-ক্ষতির কোনো বিষয় না। এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা পালন করবেন।

এদিকে, বর্তমানে টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দিতে আলোচনা চলছে বন্দর থেকে মন্ত্রণালয় সর্বত্র। এই খবর জানাজানির পর ফের সক্রিয় হয়েছে শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন। যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে না দেওয়ার দাবিতে সংগঠিত হয়েছিলেন। 

আন্দোলনে যুক্ত থাকা এই শ্রমিক নেতারা বলছেন, আগে তারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব না দিতে আন্দোলন করেছিলেন। এখন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও কথা এসেছে। 

যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে দেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, এ নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি আছে কি না? এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা বলেন, আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নৌবাহিনীর ড্রাইডককে। বর্তমানে তাদের অধীনে ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে টার্মিনালটি। আমরা চাই বন্দর কর্তৃপক্ষ এভাবে পরিচালনা করুক। কোনো দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার দরকার নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বন্দরের বর্তমানে সবচেয়ে বড় টার্মিনাল এনসিটি প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা। এই টার্মিনালে একসঙ্গে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি জাহাজ ভেড়ানো যায়। এটিতে চারটি জেটি রয়েছে এবং বন্দরের মোট কনটেইনারের প্রায় অর্ধেক হ্যান্ডলিং করা হয় এই টার্মিনাল দিয়ে। এটিতে ব্যাকআপ ফ্যাসিলিটিজ হিসেবে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি সম্বলিত ইয়ার্ড। ২০০৭ সালে ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে এনসিটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি কি গ্যান্ট্রিক্রেনসহ আধুনিক ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তীতে টার্মিনালে আরও ৫০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার স্থানান্তরের যত উন্নত যন্ত্র দরকার, সবই আছে টার্মিনালটিতে।

মোটাদাগে এই টার্মিনালে সব বিনিয়োগ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আওয়ামী লীগ আমলে দলটির নেতাদের ব্যবহার করে কোনো প্রকার বিনিয়োগ ছাড়াই টার্মিনালটি থেকে সাইফ পাওয়ার টেক হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। দেশি কিংবা বিদেশি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে তেমন সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এনসিটি থেকে বিতর্কিত সাইফ পাওয়ারটেককে সরিয়ে দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তখন থেকে বন্দর বিদেশিদের হাতে না দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন পক্ষ সরব হয়। আন্দোলনের মধ্যেই ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডকে।

বন্দরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এনসিটি হলো কোনো ধরনের বিনিয়োগ ছাড়া নিশ্চিত লাভ করার একটি ক্ষেত্র। এজন্য এটি পেতে তৎপর হয়েছেন সবাই।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন একাধিকবার বন্দর পরিদর্শন করেছিলেন। তারা চেষ্টায় ছিলেন যাতে সবাইকে ম্যানেজ করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করা যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ এ বছরের শুরুতে এসে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলন, ধর্মঘটে একপ্রকার বন্দর অচল হয়ে গেলে সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। 

তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর ফের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এটি নিয়ে ফের সরব হয় বিভিন্ন পক্ষ। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে গত ৪ জুন জারি করা দুটি চিঠিকে ঘিরেই নতুন বিতর্কের সূত্রপাত। একটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নেওয়া অথবা আগ্রহ না থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তবে একই স্মারক নম্বরে জারি করা অপর চিঠিতে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

আবার ডামাডোলের মধ্যে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এনসিটি পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। এরই মধ্যে এনসিটির পুরনো সুবিধাভোগী সাইফ পাওয়ারটেকের নেতৃত্বাধীন সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম এবং এমজিএইচ গ্রুপ রয়েছে। এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম বর্তমানে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এবং কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ। মন্ত্রণালয়ে পৃথক প্রস্তাব দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বিদেশি অপারেটরের তুলনায় তারা বন্দরকে বেশি রাজস্ব দিতে সক্ষম।

জানা গেছে, সাইফ পাওয়ারটেকের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবে টার্মিনালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই রাখার কথা বলা হয়েছে। কনসোর্টিয়াম পরিচালনা, জনবল, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণসহ দৈনন্দিন ব্যয় বহন করবে এবং এর বিনিময়ে প্রতি টিইইউ কনটেইনারে ৬৯ ডলার মাশুল চেয়েছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো অপারেশনাল বা মূলধনি ব্যয় ছাড়াই টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

অন্যদিকে এমজিএইচ গ্রুপ তাদের প্রস্তাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় প্রতি টিইইউ কনটেইনারে ৫ ডলার বেশি রাজস্ব ভাগাভাগির প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ১৫ বছরে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলে কৌশলগত এ অবকাঠামো থেকে অর্জিত অর্থের বড় অংশ দেশেই থাকবে। 

সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তাবনা দিয়েছি। ১৫ বছর এনসিটিতে কোনো ব্যয় করতে হবে না বন্দর কর্তৃপক্ষকে। বিপরীতে তারা রাজস্ব আদায় করবে। এনসিটিও বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আমরা মাশুলের বিনিময়ে পরিচালনা করব।

ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টার (টিইউসি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা চাই এনসিটি ও সিসিটি বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরা পরিচালনা করুক। বর্তমানে নৌবাহিনীর ড্রাইডকের অধীনে এটি সাফল্যের শীর্ষে রয়েছে। এখানে দক্ষ জনবল তৈরি হয়েছে। তাছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ অত্যাধুনিক সব সরঞ্জাম নিজেদের টাকায় কিনেছে। অতীতে এগুলোর মধু খেয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান। যেটির নেতৃত্বে আবারও একটি জোটবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনা করতে চায়। 

তিনি আরও বলেন, অতীতের সুবিধাভোগী কাউকে এবং কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যেন এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া না হয়, সেই দাবি জানাচ্ছি। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বলে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অথচ এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর থেকে বিতাড়িত হয়েছে। যদি সরকার এই প্রক্রিয়ায় এগোতে চায়, তাহলে আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলব। ইতোমধ্যে আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি দিয়েছি। শিগগিরই আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি অবহিত করব। 

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিষয়ে আলোচনা হবে। আন্তর্জাতিক অপারেটরের অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য বিনিয়োগ বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এমআর/এনএফ