একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সুনীল অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার ও সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক প্রবণতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল ক্রমেই সম্ভাবনাময় একটি এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে বিদ্যমান শিপব্রেকিং ও শিপইয়ার্ড খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা গেলে দেশের শিল্প অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে বলে তারা মনে করেন। এই উপজেলায় ১২৪টি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড (জাহাজভাঙা কারখানা) রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা এই শিল্পাঞ্চলে গড়ে ওঠা ১২৪টি শিপইয়ার্ডকে পূর্ণাঙ্গভাবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রূপান্তর করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে, শক্তিশালী হবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থান।
সম্প্রতি সোনাইছড়ি ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় নবনির্মিত ‘সাগরিকা গ্রিন শিপইয়ার্ড’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে আসে। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম চেম্বারের সহসভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী শিপব্রেকিং শিল্পের আধুনিকায়ন ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, সীতাকুণ্ড অঞ্চলের শিপইয়ার্ডগুলো দেশের অবকাঠামো ও ইস্পাত খাতের কাঁচামালের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করছে। ধাপে ধাপে এসব ইয়ার্ডকে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক কাঠামোর আওতায় আনা গেলে খাতটি আরও টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে সমুদ্রনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আকার কয়েক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথে সম্পাদিত হয় এবং বিশ্বের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমুদ্রনির্ভর।
বাংলাদেশ ২০১২ ও ২০১৪ সালের আন্তর্জাতিক সালিশি রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি সমুদ্র অঞ্চলে সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, যা দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে মৎস্য আহরণ, উপকূলীয় কার্যক্রম, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এসব খাতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, যদিও নির্দিষ্ট সংখ্যা সময় ও উৎসভেদে ভিন্ন হতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) বলছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন হবে, যার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎস ও বেসরকারি খাত থেকে আসতে হবে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব ও এসডিজি-ভিত্তিক বন্ড ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ড মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শিপব্রেকিং ও শিপ রিসাইক্লিং শিল্প দেশের ইস্পাত ও নির্মাণ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করে। যথাযথ নীতিগত সহায়তা, আধুনিকায়ন এবং পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে এ খাত অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। তারা আরও মনে করছেন এই সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে হলে সরকারি নীতিসহায়তা, নিরাপদ শ্রম পরিবেশ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা বলেন, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার শিপব্রেকিং ও শিপইয়ার্ড শিল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, এ খাতের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে। বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশ সমুদ্রকেন্দ্রিক হওয়ায় বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীতাকুণ্ড উপকূলভিত্তিক শিল্প গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
রুনা শাহা আরও বলেন, সামুদ্রিক অর্থনীতিভিত্তিক এ শিল্প দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ খাতে অর্থায়নে পুঁজিবাজারও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিনিয়োগনির্ভর ‘ব্লু বন্ড’ বা ‘গ্রিন বন্ড’-এর মতো আর্থিক উপকরণ চালু করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
এমআর/এমএন
