দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আগামী সপ্তাহে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার প্রধানের সফরে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। আর সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে ২১ থেকে ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার প্রধান প্রথম বিদেশ সফরের উদ্দেশে আগামী রোববার (২১ জুন) বিকালে দেশটির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে তার। পরদিন সোমবার (২২ জুন) দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিম। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে।
সরকারের এক কর্মকর্তা জানান, ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। এ সফরটা খুব ভালো হবে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণের পর টেলিফোনে কথা বলেছেন। আমাদের জন্য মালয়েশিয়া খুব গুরত্বপূর্ণ। আমাদের অনেক লোক সেখানে কাজ করেন। সেজন্য মালয়েশিয়া আমাদের জন্য বিশেষ গুরত্বের জায়গা। দেশের মঙ্গলের জন্য সফর গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবে এ সফরের প্রধান আলোচনার অগ্রাধিকার থাকবে শ্রমবাজার; বিশেষ করে বন্ধ শ্রমবাজার আবার চালু করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে শ্রমবাজার। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু, ভিসা জটিলতা, কনস্যুলার সেবার সীমাবদ্ধতা এবং অনথিভুক্ত কর্মীদের সমস্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে এবং কিছু অগ্রগতির ঘোষণা আসতেও পারে।

এ ছাড়া, সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ বিশেষ করে-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা, উচ্চশিক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট, কৃষি, হালাল খাদ্য, সুনীল অর্থনীতি, আসিয়ানের সমর্থন, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই দেশের সহযোগিতার মতো নানা ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।
সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, মূলত মালয়েশিয়া সফরটা একদিনের হবে। ২২ জুন সফরের সব আনুষ্ঠানিকতা। একদিনের হলেও সফরটি বেশ তাৎপযপূর্ণ হবে। সরকার প্রধানের সফর বিনিময় সবসময় ইতিবাচক। সফর হলে সম্পর্ক বাড়ে, কাজে গতি পায়। সফরটি ভালো হবে বলে আমরা আশা করছি। শ্রমবাজার আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এ ছাড়া, ব্যবসা, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতার মতো বিষয় আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি ইস্যু বেশ গুরত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কিছু বড় ব্যাবসায়ী কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে, সেই তালিকায় এনার্জি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী রয়েছেন।
উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের (২০২৫) আগস্টে মালয়েশিয়া সফর করেছিলন। সে সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক ও তিনটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হয়েছিল।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছিল। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রথম গন্তব্য হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান।
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী যাবেন চীনে। দেশটিতে ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত অবস্থান করবেন তিনি। দেশে না এসে মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি চীনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বন্ধ শ্রমবাজারের ‘জট’ খুলবে ?
২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তির বাজার বন্ধ বাংলাদেশের। ওই বছর মালয়েশিয়ার সরকার ঘোষণা করেছিল, আগে থেকে অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশের কর্মীদের ৩১ মে’র মধ্যে দেশটিতে যেতে হবে। এরপর কর্মী ভিসায় আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না। ওই তারিখের পর থেকে আর কোনো কর্মী যেতে পারেননি দেশটিতে। এরপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দফায়-দফায় চেষ্টা করেও এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে পারেনি।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ এই জনশক্তি বাজার আবার উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গত এপ্রিলে মালয়েশিয়া সফর করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল ইসলাম চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন দ্রুতই বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজারটি খোলার কথা বলে আসছেন। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর সফরে বন্ধ শ্রমবাজারটি খোলার ইঙ্গিতই দিচ্ছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরির কথা বলেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শ্রমবাজার সংক্রান্ত এক সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ আছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা শ্রমবাজার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফর আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে এই বাজার কোন মডেলে খুলবে, সিন্ডিকেট মুক্ত হবে কি না— সেই প্রশ্ন রাখছেন রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ, ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল। এটি হলে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হবে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরে একটি মিমাংসা হোক সেটাই আমাদের চাওয়া। আমাদের বাজার খোলা দরকার। কিন্তু বাজার খুলে যেন আবার সিন্ডিকেটর কবলে না পড়ে। আমরা বরাবরই বলে আসছি, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধন না করলে সিন্ডিকেট সুযোগ নেবেই।
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথমবার বন্ধ হয় ২০০৮ সালে। এরপর ২০১৬ সালে শ্রমবাজারটি আবার খোলা হলেও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে ২০১৮ সালে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০২২ সালে বাজারটি আবার খুললেও ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৮ এবং ২০২২ সালে সই করা সমঝোতায় স্মারকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হওয়া দেশটির শ্রমবাজার এখনও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খোলেনি।

২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে একটি চিঠি দেয়। তাতে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চাওয়া হয়। পরে মালয়েশিয়াকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ।
এই শর্তগুলো হলো—গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা ও গত তিন বছর ধরে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি স্থায়ী অফিস স্পেস থাকা। বাকি শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—অন্তত পাঁচ বছরের বৈধ লাইসেন্স থাকা, কমপক্ষে তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট ও বলপূর্বক শ্রম বা মানব পাচারে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড না থাকা।
বাংলাদেশে ২ হাজার ৫০০ এজেন্সি সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে লাইসেন্স পেয়েছে। এরমধ্যে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়া সরকারকে দিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৮ সালে প্রথম ২৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি সই হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সে দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন মালয়েশিয়ায় গেছেন। ২০২৪ সালের ৩১ মে শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়।
এনআই/এমটিআই
