বিজ্ঞাপন

শিক্ষায় জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়ের রোডম্যাপ চায় ক্যাম্প

শিক্ষায় জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়ের রোডম্যাপ চায় ক্যাম্প

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় নিশ্চিত করতে সরকারকে একটি সময়বদ্ধ অর্থায়ন রোডম্যাপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষাবিষয়ক বেসরকারি সংগঠনগুলোর জোট ক্যাম্প (ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন)। 

জোটটি বলছে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে।

বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান ক্যাম্পের উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। 

লিখিত বক্তব্য তিনি বলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে একটি জাতীয় শিক্ষা ভিশন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, যা শিক্ষা নীতি, পাঠ্যক্রম সংস্কার, অর্থায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দিকনির্দেশনা দেবে। একই সঙ্গে শিক্ষাবিষয়ক বই, জার্নাল, পরীক্ষাগার উপকরণ ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর ওপর আরোপিত কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ জানানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনুমোদিত উন্নয়ন তহবিল শতভাগ সময়মতো ছাড় নিশ্চিত করতে হবে এবং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাক্ষরতা, গণনাদক্ষতা, বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং শিক্ষকদের কর্মদক্ষতার মতো সূচকের সঙ্গে বাজেট ব্যয়কে যুক্ত করে ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

ক্যাম্প থেকে জানানো হয়, শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল শিক্ষাদানবিষয়ক প্রশিক্ষণ, কল্যাণ সুবিধা এবং কর্মজীবনে অগ্রগতির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ভিত্তিমূলক শিক্ষা পুনরুদ্ধার কর্মসূচির জন্য বিশেষ বরাদ্দ, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী—বিশেষ করে মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির আওতা ও বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ, ব্যয় ও শিক্ষার ফলাফল বিষয়ে প্রতিবছর জনসম্মুখে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় শিক্ষা কমিশন গঠন, শিক্ষা এনডাওমেন্ট তহবিল প্রতিষ্ঠা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল দক্ষতা ও জলবায়ু শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে ক্যাম্প। পাশাপাশি চা-বাগান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা ও দুর্গম অঞ্চলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিশুদের জন্য সমন্বিত প্রারম্ভিক শৈশব যত্ন ও উন্নয়ন কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এটিকে চূড়ান্ত অর্জন নয়, বরং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত; কারণ প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বরাদ্দকৃত অর্থ কতটা কার্যকরভাবে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বৈষম্য হ্রাস, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর।

সংবাদ সম্মেলনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের আকার গতানুগতিক বৃদ্ধির তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও বড় বা ছোট বাজেট নিয়ে আলোচনা অর্থপূর্ণ নয়; মূল বিষয় হলো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে কি না। শিক্ষা খাতে উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, বরাদ্দ দেওয়া হলেও অর্থ পুরোপুরি ব্যয় হয় না।

তিনি বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে রাজস্ব আয়, অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে সংকুচিত করতে পারে এবং ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার ক্ষেত্রেও ব্যয় সক্ষমতার ঘাটতি, ঋণের শর্ত এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে সাধারণত সামাজিক খাত, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেই ব্যয় সংকোচন করা হয়, কারণ অবকাঠামো উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গুণগত উন্নয়ন তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। শুধু আধুনিক শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করলেই হবে না, মানসম্মত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকও প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় করতে বেতন-ভাতা ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে দক্ষ ও পেশাদার মানুষ এই খাতে আসতে উৎসাহিত হন। বাজেট বাস্তবায়ন, বরাদ্দের ব্যবহার এবং শিক্ষা খাতে ব্যয়ের অগ্রগতি সারা বছর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, শিক্ষা খাতে চলমান ‘লার্নিং ইমারজেন্সি’ বা শেখার সংকটকে এখনো জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বেসরকারিকরণ এবং পরিবারের নিজস্ব খরচে শিক্ষা গ্রহণের প্রবণতার কারণে এই সংকট সমাজের প্রভাবশালী অংশকে সরাসরি ততটা স্পর্শ করছে না। ফলে যেসব শিক্ষার্থী দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে রয়ে যাচ্ছে, তাদের পক্ষে শক্তিশালী কোনো সম্মিলিত কণ্ঠস্বর তৈরি হচ্ছে না। এ কারণেই এত বড় সংকট থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় জনআলোচনা বা সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে না।

তিনি বলেন, এই সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতও। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদ না পেয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হয়। তাই শিক্ষা সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এটি শুধু শিক্ষা খাতের সমস্যা নয়, বরং দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় ইস্যু, যা নিয়ে আরও বড় পরিসরে আলোচনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন ক্যাম্পের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ স্ট্যাটিসিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেইনিংয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন, ক্যাম্পের কার্যক্রম ব্যবস্থাপক আব্দুর রউফ।

/এমএইচএন/এমএসএ   

বিজ্ঞাপন