বিজ্ঞাপন

তিস্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি, তর্ক-বিতর্কে সরব সংসদ

তিস্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি, তর্ক-বিতর্কে সরব সংসদ

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন চলছে। বিকেল তিনটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রশ্নোত্তর, সাধারণ বাজেট আলোচনা থেকে শুরু করে ৩০০ বিধিসহ বিভিন্ন বিধিতে আলোচনা করে থাকেন সংসদের সরকার ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। সেখানে তিস্তা প্রকল্প, কৃষি উন্নয়ন, সীমান্ত হত্যা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বাজেট ও শিক্ষা খাতের সংকটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উঠে আসে। সরকারপ্রধান জানায়, তিস্তা নদীতে আরও একটি ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রান্তিক কৃষকদের উদ্যোক্তায় পরিণত করে কৃষিখাতকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হামের টিকাদানে গাফিলতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

শুধু সরকার প্রধান নয়, মন্ত্রীরা সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে বাজেটের সমালোচনা, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি জটিলতা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং সংসদীয় বক্তব্য নিয়ে তর্ক-বিতর্কে সরগরম ছিল অধিবেশন।

বুধবার (১৭ জুন) বিকেল ৩টার পর জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়।

সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বিকেল ৩টা থেকে আসরের আযান পর্যন্ত সভাপতিত্ব করেছেন। তার ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল পরবর্তী সময়ে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদের উপস্থিত না থাকলেও প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন, তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য আরও একটি ব্যারেজ নির্মাণের লক্ষ্যে কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা নদীর উজানে বাঁধ দেওয়াসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি প্রবাহ কমে যায়। যার ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পসহ কৃষি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে উজানে অতি বৃষ্টির কারণে হঠাৎ বন্যা ও নদীভাঙন হয়।

লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তা এলাকার ৫টি জেলায় (রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এবং লালমনিরহাট) নদীভাঙন রোধে বিগত ও চলতি অর্থবছরে ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে, যা এ মাসেই শেষ করার জন্য নির্ধারিত রয়েছে। আরও উল্লেখ্য, এই কাজের মধ্যে রংপুর -৪ সংসদীয় এলাকার তিস্তা নদীর অংশে ভাঙন রোধে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪.৬ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান আছে, যার বাস্তবায়নও চলতি মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার নদীভাঙন অনেকাংশেই কমে আসবে।

তারেক রহমান বলেন, তিস্তা নদীকেন্দ্রিক টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ১১০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ (নদী শাসন), ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাঁধের উপর রাস্তা নির্মাণ, ৬৭টি গ্রোয়েন/স্পার নির্মাণ ও মেরামত এবং ১৭০ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কাজ প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য আরো একটি ব্যারেজ নির্মাণের লক্ষ্যে কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজা প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বর্তমান কৃষি-বান্ধব সরকারের মূল লক্ষ্যে হল একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তি নির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যেখানে উৎপাদন ও বিপণন হবে সম্পূর্ণ তথ্য চালিত, আমাদের প্রান্তিক কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং কৃষিখাত হবে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি।

সাংসদ মো. আব্দুল্লাহ্-এর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। আর ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে  উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।

লিথিত বক্তেব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করদাতাদের জন্য এআইভিত্তিক অনলাইন সেবা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কর আইন প্রতিপালনে সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

হামের টিকায় গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা

সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ফলে টিকাদান কার্যক্রমে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেল যোগাযোগ উন্নতকরণেও বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ রেলওয়েকে জাতীয় পরিবহন ব্যবস্থার মূল মেরুদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে রেলওয়ের সেবাকে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও প্রধান শহরগুলোর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। রেলপথে যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনা, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রধান প্রধান রুটগুলোর ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ক্রমান্বয়ে আন্তঃনগর ট্রেন ও কমিউটার ট্রেনের সংখ্যা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে যথাক্রমে ৩টি ও ১০টি, ১৫টি ও ১৬টি এবং ১০৩টি ও ৮৫টি করে বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

‎সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা মানবাধিকার লঙ্ঘন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনগুলোতে বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে সংরক্ষিত আসনের নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহতের পরিবারকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা বা চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। তবে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সব সময়ই সীমান্তে আত্মরক্ষার অজুহাতে মারাত্মক বা প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল ওয়েপন্স) ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে এবং এর ক্ষতিপূরণ ও জবাবদিহির বিষয়টি নিয়ে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। সীমান্তে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।

সিলেট-৩ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হতে এ পর্যন্ত বিএসএফের পুশ ইন করা দুই হাজার ৩৬৯ জনের মধ্যে দুই হাজার ১৭৫ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। ১১ জনকে হস্তান্তর করা হয়েছে বিএসএফের কাছে। আর ১৮৩ জনকে পুশব্যাক করা হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিএসএফের ৩৬টি পুশ ইন চেষ্টাকে বিজিবি প্রতিরোধ করেছে।
পাবনা-৫ আসনের শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মিয়ানমার সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, আন্তঃসীমান্ত বিভিন্ন অপরাধ দমনে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত সীমান্তে স্পর্শকাতর স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম বিবেচনাধীন রয়েছে।

জামালপুর-২ আসনের এ ই সুলতান মাহমুদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় কিশোর গ্যাং-এর কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় করতে এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাং সদস্যরা নিজেদের গ্যাংয়ের নামে যেসব ফেসবুক পেজ, গোপন গ্রুপ এবং টিকটক আইডি অ্যাকাউন্ট চালায় সেগুলোকে ডিএমপির সাইবার ইউনিট সার্বক্ষণিক মনিটরিং করেছে।

তিনি বলেন, র‌্যাব-২ এর আওতাধীন মোহাম্মদপুর হতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হতে এখন পর্যন্ত ১১৯টি ছিনতাইবিরোধী অভিযান চালিয়ে ২৫২ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪৩ হাজার ১০৭ এবং নারী ২ হাজার ২৯ জন। বিপরীতে আটক আছে ৭৭ হাজার ৪০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৭৪ হাজার ৩৬ জন এবং নারী ২ হাজার ৭৭ জন। যা ধারণ ক্ষমতার ১ দশমিক ৭ গুণ। ভারত কি চাইলেই কাউকে বাংলাদেশে পুশ ইন করতে পারে?

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আরিফা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, অনলাইন জুয়া/বেটিং সাইট বন্ধ এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশের জনগণকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য সংস্থা/প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্ট ফি কমানোর একটি প্রস্তাব সরকার পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে অভিবাসী কর্মী ও প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্টসেবা আরও সহজ ও সহজলভ্য করতে বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের ৪ জুন পর্যন্ত দেশে সক্রিয় পাসপোর্টধারীর সংখ্যা ২ কোটি ৫৪ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি চুক্তির কারণে বাংলাদেশ অবস্থান শক্তিশালী হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শূন্য শূল্ক সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে। চুক্তিটি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষন, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিমালী করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে।

প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্যতা, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে। ভারতের সাথে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতাসহ বিদ্যমান অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে আমরা গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছি। এছাড়া মিয়ানমারের সাথেও বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে বাংলাদেশ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নির্ভর করছে মিয়ানমারের ওপর

সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক বিষয়। এর সমাধানের গতিপ্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর। যেহেতু রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা চলছে, তাই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জোরপূর্বক বা অনিরাপদ পরিবেশে কাউকে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। তবে আমাদের সরকার রাখাইন রাজ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে একটি কার্যকর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করার বিষয়টিকে গুরত্বপূর্ণ বলে মনে করে এবং সেলক্ষ্যে আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। পরিস্থিতি অনুকূলে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়, সেজন্য আমাদের সকল প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রাখা হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগ সংসদে, পরে এক্সপাঞ্জ  

মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দিন খান বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার প্রতিযোগিতার কারণে আমরা সংবাদপত্রগুলাতে ইতোমধ্যে দেখেছি, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভনে টাকা নেওয়া হচ্ছে। এটা প্রতিদিনের রিপোর্ট আছে। তবে সরকারি দলীয় সংসদ সদস্যের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে’ এই বিষয়টি সংসদে এক্সপাঞ্জ করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এম মাহবুবউদ্দিন খোকন মেহেরপুর -১ আসনের সংসদ সদস্য বলেছেন ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। এটা দুঃখজনক ব্যাপার। সংসদে এভাবে না কথা বলা উচিত না। সংসদে ভাষা জানতে হবে। সেভাবে বলতে হবে। তাহলে বক্তব্যটা স্পষ্ট করার জন্য আমি অনুরোধ করছি। তিনি বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ চান।

এ সময় ডেপুটি স্পিকার এম মাহবুবউদ্দিন খোকনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মাননীয় সদস্য আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, আপনি মেহেরপুর-১ আসনের সদস্য তিনি তার বাজেট বক্তব্যে বলেছেন ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে প্রলোভন দিয়ে ধর্ষণ করেছেন। এই বক্তব্যটা এক্সপান্স চাচ্ছেন। এইটাই তো আপনার বক্তব্য? হ্যাঁ আমিও শুনেছি এরকম কথা বলেছেন। পয়েন্ট অব অর্ডারে আপনি দাঁড়িয়েছেন। এই স্টেটমেন্টটা এক্সপান্স করা হলো।

এরপর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে সিরাজগঞ্জ- ৪ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দিন খানকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সুযোগ চান। তিনি বলেন, এক্সপাঞ্জ তো হবে যদি অসত্য তথ্য দিয়ে থাকেন। অথবা অসংসদীয় শব্দ যদি ব্যবহার করে থাকেন তাহলে এক্সপঞ্জ হবে। আমার ধারণা উনি এ ধরনের কথা বলেনেনি। কাজেই উনাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হোক।

এরপর মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্যকে কথা বলার সুযোগ দেন ডেপুটি স্পিকার। সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দিন খান বলেন, আমার আলোচনার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অনেক জায়গায় আমি এটা ব্যবহার করেছিলাম। অবশ্য এই কথাটার উপর মাননীয় সদস্য (এম মাহবুব উদ্দিন খোকন) আপত্তি করেছিলেন শুনেছি। আমার কাছে যে তথ্য আমার কাছে ছিল তা সময়ের অভাবে দিতে পারিনি। ২০২৬ সালের ১০ এপিল ফরিদপুরে সোনাগাজী থানাতে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগের একটি মামলা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে। ওসি সাহেব এর প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে বলে এটা প্রমাণ হয়েছে। ২৫/৪/ ২০২৬ রংপুর মিঠাপুর উপজেলার ভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের বিএনপির সহসম্পদ এনামুল হক, তাকে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কারণে। এরপর এম মাহবুব উদ্দিন খোখন দাঁড়িয়ে গেলে স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাকে বসতে বলেন।

বাজেটটি চানাচুর মার্কার মতো, খেলে পেট খারাপ হবে : আমির হামজা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘লোটপাটের বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা। তিনি বলেছেন, এই বাজেট অনেকটা চানাচুর মার্কার মতো, যা শুনতে ভালো লাগলেও খেলে পেট খারাপ হয়। আমির হামজা বলেন, জাতীয় বাজেট জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার মাধ্যম হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধির জন্য কর প্রশাসনকে আধুনিকায়ন করতে হবে এবং কর ফাঁকি ও অর্থপাচার রোধে কঠোর হতে হবে। সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না বাড়িয়ে নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া দেশের বড় সমস্যা বেকারত্ব দূর করতে শিল্পায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান।

বাজেট নিয়ে সরকারের দাবির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার বলছে বাজেট নিয়ে নাকি আনন্দের বন্যা বইছে। অথচ বাজেট উপস্থাপনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন হয়েছে। বিগত সময়ের মতো এবারের বাজেটের অর্থও যেন সরকারি দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পাচার করতে না পারে, তার নিশ্চয়তা দাবি করেন তিনি। গতানুগতিক কথায় সমস্যার সমাধান হবে না। অর্থপাচার ঠেকাতে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পলিসি জনগণের সামনে স্পষ্ট নয়।

মামলা জটিলতায় শিক্ষক নিয়োগ-পদোন্নতি আটকে রয়েছে : শিক্ষামন্ত্রী 

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, বিভিন্ন মামলা জটিলতার কারণে দেশের হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি একথা বলেন। এর আগে সরকারি দলের সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ৩২ হাজার ৫০০ শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ছাড়াও আরও ২ হাজার ৬০০ এবং ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রমও মামলার কারণে ঝুলে রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি এসব জটিলতা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার প্রথম সপ্তাহ থেকেই আদালতপাড়ায় গিয়ে এসব মামলার জটিলতা নিরসনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আপিল বিভাগে মামলাগুলো কার্যতালিকায় আসছে না। ফলে সারা দেশে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মন্ত্রী আরও বলেন, শুধু শিক্ষক নিয়োগই নয়, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ এবং কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগও মামলার কারণে আটকে আছে।

তিনি সংসদকে জানান, দেশে ইতোমধ্যে আরও প্রায় ৩৩ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে। কিন্তু পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতা ও মামলার কারণে অনেক যোগ্য শিক্ষক প্রধান শিক্ষক হওয়ার আগেই অবসরে চলে যাচ্ছেন। মন্ত্রী বলেন, সারা বাংলাদেশে এমন বহু শিক্ষক রয়েছেন, যারা প্রধান শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। মামলার জটিলতার কারণে বিষয়গুলো সমাধান করা যাচ্ছে না।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বদলির বিষয়ে তিনি জানান, এ সংক্রান্ত দায়িত্ব উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিচারাধীন মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হচ্ছে।

এমএসআই/বিআরইউ