বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার

রিজার্ভ চুরিতে ড. আতিউর রহমানসহ ৯ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ

রিজার্ভ চুরিতে ড. আতিউর রহমানসহ ৯ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার খসড়া অভিযোগপত্রে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রস্তুত করা অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের দায়িত্বে অবহেলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে বলে সিআইডি সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, রিজার্ভ চুরি মামলায় মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, মেজবাউল হক ও আবুল কাসেমসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের ১০ অভিযুক্তের মধ্যে ৯ জনই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা এ অর্থ সরিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার দিন সুইফট সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফিশিং লিংক থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতির তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার পর বিষয়টি জানার পরও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হয়েছিল।

আরও জানা গেছে, মামলার তদন্তে দেখা গেছে বাংলাদেশের এই ১০ জন অভিযুক্তর বিরুদ্ধে গাফিলতি এবং দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তারা অজানা কারণে ঘটনার দিনে সুইফ সিস্টেমের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করেননি। ব্যাংকিং কার্যক্রম শেষে তারা হ্যাকারদের পাঠানো ফিশিং লিংকে ক্লিক করে সেটি ওপেন রেখে ব্যাংক থেকে বের হয়ে চলে যান। তারা সিস্টেমের যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে বের হয়ে চলে যান। ফলে হ্যাকাররা ঐ লিংক ব্যবহার করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি করে নিয়ে যায়। ঘটনার পর অভিযুক্তরা বিষয়টি  জানতে পারলেও পরে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। উল্টো তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালান। এছাড়া তদন্তে রিজার্ভ চুরির  ঘটনায় তাদের আরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, তদন্তের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশীয় ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠনের পর পুনরায় তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।

সিআইডি সূত্র জানায়, তদন্তের শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। চুরির ৪১ দিন পর মামলা হওয়ায় তদন্তকারী দল প্রকৃত ক্রাইম সিনে প্রবেশের সুযোগ পায়নি। এর আগেই একটি অননুমোদিত বিদেশি আইটি ফার্ম ও দেশীয় কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করেছিলেন। এরপরও তদন্তকারী দল দেশ-বিদেশ থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেয়।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে, খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করেছে সিআইডি। এতে দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ১০ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট ও খসড়া চার্জশিটে উঠে এসেছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিস্তর ফরেনসিক তথ্যপ্রমাণ।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতিতে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ওই কমিটির তত্ত্বাবধানে রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। পরে গত ১ এপ্রিল খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করে সিআইডি। খসড়া অভিযোগপত্রে দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ফিলিপাইনের ৩৬, উত্তর কোরিয়ার ২, চীনের ৩, শ্রীলঙ্কার ৮, জাপানের ১, ভারতের ৪ এবং বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

রিজার্ভ চুরির মামলার সবশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, “রিজার্ভ চুরির মামলা তদন্তের ৮০ শতাংশ কাজ প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা সম্পন্ন করে গেছেন। পরবর্তীতে দুজন তদন্তকারী কর্মকর্তা আরো কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সবশেষে আমি চেষ্টা করেছি নির্ভুল একটি চার্জশিট প্রস্তুত করতে। তদন্তে আমাদের আর কোনো কাজ পেন্ডিং (বাকি) নেই। ইতিমধ্যেই শতভাগ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করে এ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনি পরামর্শও চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত আইনি পরামর্শ পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।”

পূর্বে এ মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব থাকা একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তদন্তের শুরুতে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। বিশেষ করে চুরির ৪১ দিন পর মামলা হওয়ায় তদন্তকারী দল প্রকৃত ক্রাইম সিনে প্রবেশের সুযোগ পায়নি। এর আগেই একটি অননুমোদিত বিদেশি আইটি ফার্ম ও দেশীয় কয়েকজন অননুমোদিত ব্যক্তি ক্রাইম সিনে প্রবেশ করেছিলেন।

তারা আরও জানান, তবে এরপরও সিআইডির তদন্ত দল দক্ষতার সঙ্গে দেশ-বিদেশ থেকে মামলার প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে সংগৃহীত আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডির আইটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। পাশাপাশি ফিলিপাইনের আরসিবিসির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মায়া দিগুতির বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। যেখানে তিনি কয়েকজন বিদেশি আসামির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই অর্থ সরিয়ে নেয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে।

এমএসি/এমটিআই