• ওভেন-ওয়াশিং মেশিন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
• মুতা বিয়ে, পরকীয়া ও মামুনুল হককে নিয়ে সংসদে আলোচনা
• এই সংসদ ঋণ খেলাপিদের, বললেন রুমিন ফারহানা
জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ঋণ খেলাপি, মুতা বিয়ে, পরকীয়া এবং মামুনুল হককে নিয়ে বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য দিয়ে সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়েছেন সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা।
বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদকে ‘ঋণ খেলাপিদের সংসদ’ বলে আখ্যায়িত করলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে তার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। অধিবেশনের শুরুতেই মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিন ও পর্দা ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আলোচনা। অধিবেশনে ‘জুলাই যোদ্ধা’দের চিকিৎসা, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ, স্পিকারের মর্যাদা, ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গ এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়। ফলে অর্থনৈতিক আলোচনার গণ্ডি ছাড়িয়ে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে সরগরম হয়ে ওঠে সংসদ।
আজ (বৃহস্পতিবার) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশের ১০ম দিনে মুলতবি অধিবেশন বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকলেও তিনি আজ কোন বক্তব্য রাখেননি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, এই সংসদ ঋণ খেলাপিদের। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সলাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে যারা আছেন, কেউ ঋণখেলাপি নন। পাশাপাশি রুমিন ফারহানার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানানো হয়। অপরদিকে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ না করার পক্ষে বক্তব্য দেয় বিরোধীদল। পরে বক্তব্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানান ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ঋণ খেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশে টোটাল মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এরসঙ্গে যদি আপনি অবলোকন পুনঃ তফসিল করা এবং মামলার কারণে যে ঋণের টাকাটা আটকে আছে আদালতে অর্থাৎ পেন্ডিং মামলা হিসেবে যেটা এখনো খাতায় তোলা হয় নাই, সেটা যদি আমরা যোগ করি এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১১ লাখ কোটি টাকা। যেটা মোট ঋণের ৫৯.৭৩ শতাংশ। সুতরাং ব্যাংকগুলো চাইলেও সরকারকে বেশি সহায়তা দিতে পারবে না।

রুমিন ফারহানার এই বক্তব্য একপাঞ্জ করার দাবি জানান গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন। তিনি বলেন, আমরা অনেকেই অবচেতন মনে হোক, সচেতন মনে হোক এমন কিছু কথা সংসদে উচ্চারণ করি, যা আমাদের মর্যাদাকে খাটো করে। আজকের বক্তব্য চলাকালীন মাননীয় সংসদ সদস্য আবু তালেব (মূলত বক্তব্য দিয়েছেন ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা) উনি এক জায়গায় বলেছেন, ঋণ খেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে....এই যে ‘ঋণ খেলাপিদের এই সংসদ’ — এই শব্দ কোথা থেকে পেলেন? তখন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, মাননীয় সদস্য এটা ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বলেননি। আমি যতটুকু শুনতে পেরেছি এটা রুমিন ফারহানা বলেছিলেন।
তখন মিলন বলেন, যেই বলুক এই কথাটার প্রেক্ষিতে বলছি। এইখানে নির্বাচিত হয়ে নিজের মর্যাদা হানি করার জন্য যদি আত্মঘাতী সমালোচনা, আত্মঘাতী কথা বলি, ঋণ খেলাপি হয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে না.... সেখানে ঋণ খেলাপিদের সংসদ কী করে হয়? আমি অনুরোধ করবো আপনি এই শব্দটি এখান থেকে এক্সপাঞ্জ করবেন।
এরপর অধিবেশনে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম সংসদ সদস্যদের ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, আমি প্রথম অধিবেশনেও অনেক সম্মানিত সংসদ সদস্যের কত ঋণখেলাপি রয়েছে, তার সংখ্যা উল্লেখ করেছিলাম, তবে সম্মানের কারণে নাম প্রকাশ করিনি। এখন যে দল ঋণখেলাপিদের নোমিনেশন দিয়ে সংসদে নিয়ে আসে, এটা তাদের দায়। সংসদে এতগুলো ঋণখেলাপি থাকলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই সংসদকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলবে।
তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সংসদকে আমরা সার্বভৌম বলি। এখন এই সংসদে যদি আমরা ঋণ খেলাপিদের ‘ঋণ খেলাপি’ বলতে না পারি, তাহলে কোথায় বলব? আমার অনুরোধ থাকবে, এ ধরনের শব্দ এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার মতো কোনো বক্তব্য নয়।
এরপরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মহান জাতীয় সংসদের সব সদস্যকে সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের উচিত। এখানে যারা আছেন, কেউ ঋণখেলাপি নন। নির্বাচনী আইন (আরপিও) এবং অন্যান্য বিধিমালা অনুসারে, আদালত কর্তৃক কেউ ঋণখেলাপি সাব্যস্ত হলে তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হন। তার নমিনেশন অবৈধ হয়ে যায়। যাদের নমিনেশন দেওয়া হয়েছে, তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যাংকের বা প্রাইভেট মামলা ছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট থেকে সেগুলো নিষ্পত্তি হওয়ার পরই তারা বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে ‘ঋণগ্রস্ত’ হতে পারেন, কিন্তু ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে তাদের ডিফেম (মানহানি) করা হচ্ছে। এটি মানহানিকর বক্তব্য, এটি এক্সপাঞ্জ হওয়া উচিত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ফ্লোর নিয়ে টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) তথ্য উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, টিআইবি সম্প্রতি বলেছে, এই সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। আইনজীবী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু একজন আইনজীবী, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কীভাবে রিশিডিউলিং করা হয়, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সিআইবির (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) নাম আসার পর কীভাবে রিট পিটিশন দাখিল করে তা স্টে (স্থগিত) করে ইলেকশন করা হয় এবং এরপর আবারও সুদ দেওয়া বন্ধ করা হয়, সেটাও আমরা ভালো বুঝি।
একটি স্বপ্নবিলাসী ও উচ্চাভিলাষী বাজেট : আইনমন্ত্রী
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট একটি স্বপ্নবিলাসী ও উচ্চাভিলাষী বাজেট, যা বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, একসময় বাজেট উপস্থাপনের পর ‘গরিব মারার বাজেট’ কিংবা ‘বড়লোকের বাজেট’ বলে সমালোচনা করা হতো। কিন্তু এবারের বাজেটকে ঘিরে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কারণ এই বাজেট গরিব, মধ্যবিত্ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, এ বাজেট দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার রূপরেখা এতে তুলে ধরা হয়েছে।
মাইক্রোওয়েভ ওভেন আর ওয়াশিং মেশিন নিয়েও উত্তেজনা
জাতীয় সংসদে দুইদিন ধরে মাইক্রোওয়েভ ওভেন আর ওয়াশিং মেশিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গতকাল বুধবার সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটগুলোতে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান। একইসঙ্গে তিনি ফ্ল্যাটগুলোর দরজা-জানালায় পর্দা লাগানোরও দাবি জানিয়েছেন। তার এই দাবির বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ। একই সঙ্গে প্রয়োজনে তিনি মাইক্রোওয়েভ ওভেন দিতে চেয়েছেন। এরপরেই আন্দালিব রহমানের ওভেন দিতে চাওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান। এসময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, আর বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই।
গত বুধবার নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে মিজানুর রহমান বলেন, সংসদ সদস্যরা অনেক টাকার সম্পূরক বাজেটও পাস করেছেন। কিন্তু এই সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোয়, থাকার জন্য যেটা দেওয়া হয়েছে, তার দরজা-জানালার পর্দা এখনও পর্যন্ত ঝোলানো হয়নি।
স্পিকারকে উদ্দেশ করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুনেছিলাম যে, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোয় একটি করে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেনও দেওয়া হবে। এই পর্দা, মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিনগুলো আপনার মাধ্যমে পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
এই বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, পয়েন্ট অব অর্ডার সংসদ চলাকালীন বা সংসদের ব্যাপারে হতে হবে। এজন্য আমি মনে করলাম যে, এটা একটা ব্রডার কনটেক্সটে সংসদকে এফেক্ট করে। অনেক কষ্টের পরেই এই পার্লামেন্ট আমরা পেয়েছি এবং আমি আমার প্রথম স্পিচেও বলেছিলাম যে, এটা বেস্ট পার্ট অফ দ্য পার্লামেন্ট। এই যে এখানে স্বৈরাচারের কোনও দোসর বা ফ্যাসিস্টের কেউ নেই। গত পার্লামেন্ট শুধু গণতন্ত্রকে হত্যা করেনি, পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডকে সাংঘাতিকভাবে নষ্ট করেছে। আমরা দেখেছি এখানে মমতাজের গান হয়েছে। এখানে অন্য কিছু হয়েছে।
পার্থ বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, ডাইরেক্টলি ওদিকে না গেলেও কিছু কিছু জায়গায় কিন্তু আমরা ওদিকে চলে যাচ্ছি। আমরা কিন্তু মেম্বার অব পার্লামেন্ট ছাড়াও অ্যাম্বাসেডরস অব দ্য পার্লামেন্ট। আমরা যখন বাইরে কোথাও যাই, আমরা পার্লামেন্টকে রিপ্রেজেন্ট করি। গত দিন পার্লামেন্ট থেকে যাওয়ার পরে আমি অনেক টেলিফোন পাই এবং সেখানে আমি ডিফেন্ড করার চেষ্টা করি। ডেইলি স্টার নিউজ করে জামায়াত এমপির ডিমান্ডস ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, অ্যান্ড কার্টিনস— এটা আমাকে অনেক লজ্জা দেয়। আমি মনে করি, এটা এই পার্লামেন্টকে অনেক লজ্জা দেয় যে— একটা মেম্বার অব পার্লামেন্ট এখানে দাঁড়িয়ে যেখানে জনগণের কথা বলবে, জনগণের দাবির কথা বলবে— সেখানে উনি ওয়াশিং মেশিন পেল না, মাইক্রোওয়েভ পেল না, সেই ব্যাপারে বলছে।
এরপর আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান বলেন, মাননীয় সদস্য (পার্থ) পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, আপনি (স্পিকার) তো প্রথমেই নাকচ করেছেন যে, এটা পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয় না। দুই নম্বর, একজন সদস্য (জামায়াত নেতা মজিবুর রহমান) তিনি সবার জন্য একটা বিষয় চেয়েছেন। আপনি (স্পিকার) রাইটলি বলেছেন যে, এটা হাউজে না হলে এটার জন্য কমিটি আছে ওখানে বললেই হতো। নিজের থেকে অফারও দিয়ে দিলেন যে, আমি সব দিয়ে দেবো। ওনার কাছে চাইছে নাকি কেউ যে, উনি দেবেন? আমার মনে হয় যে, আমাদের মানসিকতাগুলা এমন হওয়া উচিত— যেটা এখানে দাঁড়িয়ে অন্তত কেউ কারো সম্মানে আমরা আঘাত করবো না।
বিরোধী দলীয় নেতা আশা প্রকাশ করে বলেন, আমরা আশা করবো যে, আমিসহ আমরা সকলেই আগামীতে এগুলোর প্রতি আরও যত্নশীল হবো।
এ বিষয়ে স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেতা এটা নিয়ে কোনও বিতর্ক হোক এটা আমি চাই না। আমি মনে করি, এটা সংসদে না বললেও ভালো হতো। কিন্তু এটা বলে এমন কোনও অপরাধও তিনি করেননি। এই সামান্য জিনিস নিয়ে আর তর্ক-বিতর্ক চাই না। ভবিষ্যতে বক্তব্য রাখার সময় আমরা সবাই কেয়ারফুল থাকবো।
মুতা বিয়ে, মামুনুল হককে নিয়ে সংসদে আলোচনা
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলের একটি ঘটনা জাতীয় সংসদের আলোচনায় তুলেছিলেন ঢাকা-১ আসনের এমপি খোন্দকার আবু আশফাক। সরকারি ও বিরোধী দলের অনুরোধে বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হকের বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া এখনো কিন্তু তিনি (মামুনুল হক) তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক, চাই না।
প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় বিএনপির এমপি খোন্দকার আবু আশফাক বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হক অনেক বড় বড় কথা বলছেন। বাজেট নিয়ে তিনি সরকারের পতন ঘটাবেন, অনেক কিছু ঘটাবেন। কিন্তু তিনি যে গাজীপুরে নারীসহ ধরা পড়লেন, মুতা বিয়ের নামে, সেটা আসলে কী ছিল?’
এমপি বলেন, ‘ছাত্রশিবির নেতা জিসান...এই ইতিহাসও আপনারা....।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে কিছু একটা বলতে দেখা যায়। তখন বক্তব্যের ইস্যু পরিবর্তন করেন খোন্দকার আবু আশফাক।
আবু আশফাক বলেন, ইসলামী ব্যাংক মানে একটা দেশ না, ইসলামী ব্যাংক একটি ব্যাংক। সেটার জন্য (সংসদে আলোচনা) এক ঘণ্টা সময় নষ্ট করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এই এমপি বলেন, ‘সিগারেট-মদের বিষয়ে ওই পাশ (বিরোধী দল) থেকে বলা হয়েছে, এগুলো ট্রেজারি বেঞ্চ খায় বলে রাখা হয়েছে। আমি জানি না, আল্লাহ জানেন, কার কী অভ্যাস আছে।’
এরপর আবু আশফাক মুতা বিয়ের বিষয়ে স্পিকারের কাছে জানতে চান।
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় বক্তব্যে না আনাই ভালো। একজন রাজনৈতিক নেতার পরকীয়া সম্পর্কে আপনি মন্তব্য করেছেন। সাধারণত যার এখানে এসে জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে অভিযোগ তোলা সংসদে সমীচীন নয়। মুতা বিয়ে সম্পর্কে আমার কাছে কেন জানতে চাইলেন? আমাকে এসবের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মনে হয়? মুতা বিয়ে হলো সম্ভবত কেউ বিদেশে গেলে, আগের কালে নিয়ম ছিল, সাময়িক এক মাসের জন্য সো কল্ড বিয়ে করতে পারতেন বা একজন সঙ্গী খুঁজে নিতে পারতেন। এগুলো নিয়ে সংসদে আলাপ-আলোচনা না করা ভালো।
পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, মুতা বিয়ের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞ না, তবে কনসেপ্টের বিষয়ে আমি জানি। মামুনুল হক সাহেবের বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, এটা একেবারেই ভুল তথ্য। উনি মুতা বিয়ে করেননি। গাজীপুরে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাকে হেনস্তা করা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে। উনি বিয়ে করেছিলেন, এটা এস্টাবলিশড। বিয়ে করা জায়েজ। এরপর তিনি মামুনুল হককে নিয়ে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করেন।
সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, যা অসংসদীয় এবং সমীচীন নয়, তা কার্যবিবরণী হতে এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করছি।
তখন স্পিকার বলেন, মাওলানা মামুনুল হকের এ বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া এখনো কিন্তু তিনি (মামুনুল হক) তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক, চাই না।’
পয়েন্ট অব অর্ডারে জামায়াতের এমপি মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি এ প্রসঙ্গটাকে থামানোর জন্য ইশারায় মাননীয় সংসদ সদস্যকে নির্দেশ দিয়েছেন। একসময় মুতা বিয়ে করা যেত। এটা এখন হারাম হয়ে গেছে, নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। এখন করা যাবে না।’
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টে মামুনুল হককে নারীসহ অবরুদ্ধ করেন স্থানীয়রা। সেখানে পুলিশ গিয়ে মামুনুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তখন খবর পেয়ে হেফাজতের কর্মী-সমর্থক ও মাদ্রাসার ছাত্ররা ওই রিসোর্টে হামলা চালিয়ে তাঁকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন।
সংসদে সভাপতিকে ‘ঝুঁকিয়া’ সম্মান জানানোর বাধ্যবাধকতা নেই : স্পিকার
জাতীয় সংসদে সভাপতির প্রতি ‘ঝুঁকিয়া’ সম্মান জানানোর বাধ্যবাধকতা কার্যপ্রণালী বিধিতে আর নেই বলে জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেন, ‘গত ১৬ জুন রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান এবং ১৭ জুন নোয়াখালী-২ আসনের সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক পয়েন্ট অব অর্ডারে সভাপতির প্রতি ঝুঁকিয়া সম্মান জানানোর প্রচলিত রীতি সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে আমি তখন আশ্বস্ত করেছিলাম।’
স্পিকার বলেন, কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৭(১) অনুযায়ী সংসদের বৈঠক চলাকালে কোনো সদস্য সংসদে প্রবেশ বা প্রস্থান এবং আসন গ্রহণ বা ত্যাগের সময় সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন। তবে ২০০৬ সালে বিধিটি সংশোধন করে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, অষ্টম জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করে। পরে ২৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি সংসদে বিবেচিত ও গৃহীত হয়, যেখানে ২৬৭(১) বিধির সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। রুলিংয়ে স্পিকার বলেন, ‘আমাদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৭(১) বিধি হতে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। সেহেতু সংসদ সদস্যবৃন্দ জাতীয় সংসদে যার যার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী স্পিকারের চেয়ারের প্রতি বা সভাপতির প্রতি সম্মান জানাবেন।’ এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা নেই বলে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫০ জন জুলাইযোদ্ধা : আহমেদ আযম খান
সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুতর আহত ১৫২ জন জুলাই যোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়ায় প্রেরণ করা হয়েছে। ১০২ জন চিকিৎসা শেষে বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও মাসিক সম্মানী ভাতার বিষয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
মাসিক সম্মানী ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত মোট ১৪ হাজার ৩৬৯ জনের মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪৪ জন জুলাই যোদ্ধাকে তাদের নিজস্ব ব্যাংক একাউন্টে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা (ক-শ্রেণি প্রতিজন ২০,০০০ টাকা, খ-শ্রেণি প্রতিজন ১৫,০০০ টাকা, গ-শ্রেণি প্রতিজন ১০,০০০ টাকা হারে) প্রদান করা হচ্ছে। অবশিষ্ট জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা প্রদান কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ২০ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ : কৃষিমন্ত্রী
বন্যা-পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে হাওর এলাকার সাত জেলার কৃষকদের জন্য ২০ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৯৫০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ।
সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে মন্ত্রী জানান, অতি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা-পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মোট ২ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ জন কৃষক এ সহায়তার আওতায় আসবেন।
তিনি বলেন, এ কর্মসূচির মধ্যে উফশী আমন ধান উৎপাদন কার্যক্রমে ১ লাখ ৩১ হাজার কৃষক, মরিচ উৎপাদন কর্মসূচিতে ৩ হাজার ৫০০ জন কৃষক এবং ফলদ, বীজ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ১ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ জন কৃষক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সব মিলিয়ে ২ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ জন কৃষকের জন্য মোট ২০ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৯৫০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্যের সুযোগ না পাওয়ায় ক্ষোভ
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় নিজের ‘নির্ধারিত সিরিয়াল’ পরিবর্তন করার অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-২ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। এ কারণে প্রথমে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে তিনি আলোচনায় অংশ নেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশন পরিচালনা করছিলেন। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় বক্তব্য দেওয়ার জন্য সেলিম ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেন ডেপুটি স্পিকার। তাকে ছয় মিনিট সময় বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বক্তব্য শুরু না করে সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি আজ বক্তব্য দেব না। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমি হলাম শিক্ষক। ৪৬ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় আছি। আমার কাজই বক্তব্য দেওয়া। আমাকে দেন ছয় মিনিট, অন্যদের দেন ১০ মিনিট, ১২ মিনিট। এই প্রতিবাদে আমি বক্তব্য দিলাম না।’
সিরিয়ালও পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার সিরিয়াল ছিল আজকে আট নম্বরে। আট নম্বর সিরিয়াল যদি ঠিকমতো রাখা হতো, আমার বক্তব্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে হতো। এখান থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এজন্য আমি বসে পড়লাম, আমি বক্তব্য দেব না।’
এখন কি আমরা বলবো সবার আগে বগুড়া?
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেছেন, ‘নিন্দুকেরা বলে, একসময় বলা হতো সবার আগে গোপালগঞ্জ। এখন কি আমরা বলব সবার আগে বগুড়া? আমরা এই বাংলাদেশ চাই না। সবার আগে বাংলাদেশ হলে, প্রতিটা প্রান্তের মানুষের জন্য সমান ধরনের বাজেট থাকতে হবে।’
আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, ইদানিং নিন্দুকেরা বলে, নতুন একটা উপজেলার আবির্ভাব ঘটেছে, এটাকে নবাবী উপজেলা বলা হচ্ছে। আমি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কথা বলতেছি। যেখানে অন্যান্য এলাকায় বাজেট পায় না, সেখানে এক উপজেলায় কী এক ক্যারিশমাটিক মিরাকল... সেখানে ৭৬ কোটি টাকা চলে যায়।
এমএসআই/এনএফ
