জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর কর-শুল্ক প্রত্যাহার এবং ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) কর্তৃক ‘জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাত : নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম, জলবায়ু কর্মী ফারাহ আনজুম, ক্লিনের নেটওয়ার্কিং অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা।
হাসান মেহেদী বলেন, সরকার যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে এনবিআরের এই এসআরও সেই অগ্রযাত্রার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি অবিলম্বে বাতিল করে কর-সুবিধা সব নাগরিক ও উদ্যোক্তার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
একদিকে সরকার এলএনজি আমদানিকে বড় অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানির ওপর বিদ্যমান কর-সুবিধা বহাল রেখেছে। পাশাপাশি কয়লা আমদানির কর ছাড় বৃদ্ধি, নতুন রিফাইনারি স্থাপন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেশের সবুজ রূপান্তরকে ধীর করে দিতে পারে।
বাজেটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ মাত্র ৩৭৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ২.২ শতাংশ। অথচ ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বছরে কমপক্ষে ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, আবাসিক সৌরবিদ্যুতের জন্য সরাসরি ভর্তুকি দেওয়া, করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (করপোরেট পিপিএ ) দ্রুত কার্যকর করা, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর প্রগতিশীল নির্গমন কর আরোপের দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেট ও নীতিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। শুধু ছাদ সোলারের লক্ষ্য নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। রাজধানীর বাইরে চলমান লোডশেডিং ও জ্বালানি বৈষম্য দূর করতেও বাজেটে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ক্লিনের নেটওয়ার্কিং অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার। যত দ্রুত আমরা এগোবো, অর্থনীতি তত লাভবান হবে। তাই এই খাতে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, একটি বাজেট তখনই মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন তা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। বৈষম্য রেখে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে সরকারকে কার্যকর প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাহিদা পূরণে বাজেট ও নীতির যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত ৭ দফা দাবি হলো-
১। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৮ জুন ২০২৬ জারি করা এসআরও বাতিল করে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক ও কর আগামী ১০ বছরের জন্য বাতিল করতে হবে যা সবার জন্য প্রযোজ্য হবে।
২। বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন করতে হবে যা বাংলাদেশ ব্যাংক বিনাসুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোক্তাদের দেবে। এক্ষেত্রে পুনর্তহবিল নয় বরং পূর্বতহবিল সরবরাহ করতে হবে।
৩। নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে বাজেটে আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা (২০০ মার্কিন ডলার) সরাসরি ভর্তুকি বরাদ্দ করতে হবে। বৈষম্য দূর করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকল্পে অতিরিক্ত ১০% ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।
৪। শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে, অবিলম্বে করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির নির্দেশিকা সক্রিয় করতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক হুইলিং চার্জ চালু করতে হবে, যাতে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
৫। নতুন অনুমোদিত সব ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পের সঙ্গে ন্যূনতম ২০ শতাংশ ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে।
৬। স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতি বছর দশ লাখ পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তর ও জনশক্তি বিভাগের উদ্যোগে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে উচ্চ-দক্ষতার কাজে বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
৭। দূষণকারীদের নিরুৎসাহিত করতে এবং সবুজ ব্যবসা উদ্যোগে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দূষণকারী শিল্প-কারখানার উপর প্রগতিশীল নির্গমন কর আরোপ করতে হবে।
ওএফএ/আরএফ/জেডএস
