বিজ্ঞাপন

তথ্যের আড়ালে লুকোচুরি নয়, সবার জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে সরকারি পরিসংখ্যান

তথ্যের আড়ালে লুকোচুরি নয়, সবার জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে সরকারি পরিসংখ্যান

জাতীয় পরিসংখ্যানের ওপর জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে সরকারি তথ্যের আড়ালে কোনো লুকোচুরি থাকবে না; বরং গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতিপ্রণেতাদের জন্য জাতীয় পরিসংখ্যানগত সমস্ত ডেটা আরও সহজ ও উন্মুক্ত করা হচ্ছে।

সোমবার (২২ জুন) ঢাকার শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নবপ্রতিষ্ঠিত ‘মাইক্রো ডাটা অ্যানালাইসিস ল্যাব’ সংক্রান্ত এক অংশীজন অবহিতকরণ কর্মশালায় সরকারের এই বড় সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে দারিদ্র্যের হার, জনসংখ্যা ও আয়ের পরিসংখ্যানসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের নির্ভুলতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে সরকারি তথ্যের ওপর জনসাধারণের এক ধরনের গভীর সংশয় ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, সরকার তথ্য সংগ্রহ এবং তা প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে অতীতের মতো তথ্য নিয়ে কোনো লুকোচুরির সুযোগ না থাকে। 

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ, যেকোনো পলিসির কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। সরকার তথ্যের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ খোলামেলা নীতিতে বিশ্বাসী। গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশের সাধারণ নাগরিকরা যেন দেশের বাস্তব পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সঠিক বেসলাইন তথ্য না থাকলে সরকারের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে কি না, কিংবা দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফল হচ্ছে কি না, তা সঠিকভাবে পরিমাপ করা অসম্ভব।

কোরিয়ান সংস্থা কোইকার (KOICA) সহায়তায় পরিচালিত ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব স্ট্যাটিস্টিকস সার্ভিস বেসড অন প্ল্যাটফর্ম’ প্রকল্পের আওতায় এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নবপ্রতিষ্ঠিত এই মাইক্রো ডাটা অ্যানালাইসিস ল্যাবের মাধ্যমে অনুমোদিত ব্যবহারকারীরা একটি নিরাপদ পরিবেশে সম্পূর্ণ শুমারি এবং জরিপের মাইক্রো ডাটা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন, যা আগে কেবল সীমিত আকারে প্রকাশ করা হতো।

বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, তথ্যের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষাকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গবেষকরা ল্যাবে এসে সরাসরি তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবেন, তবে কোনো মূল বা কাঁচা ডেটা ল্যাবের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। ল্যাবের একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাইয়ের পর কেবল টেবিল, গ্রাফ ও বিশ্লেষণাত্মক ফলাফলগুলোই গবেষকদের দেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী সাকি আরও জানান, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো স্বাধীন গবেষণাকে উৎসাহিত করা, যা দেশের সরকারি নীতিমালার উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। মানসম্মত তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হলে আমাদের তরুণ শিক্ষার্থী এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আরও গভীর বিশ্লেষণ করতে পারবে, যা জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগবে। তবে সুরক্ষার স্বার্থে এখনই এই তথ্য অনলাইনে উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি আরও জোরদার করে ধীরে ধীরে এর পরিধি ও সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার এই গবেষণাগারটিকে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান পরিসেবাকে আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি এর নিয়মতান্ত্রিক পরিচালনা পদ্ধতি ও স্বচ্ছ আবেদন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন।

বিবিএসের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল ইসলাম বলেন, এই সুবিধাটি অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং নীতিপ্রণেতাদের জন্য সরকারি ডেটা ব্যবহারের একটি নিরাপদ ও সুশাসিত কাঠামো তৈরি করবে।

কোইকা বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম জানান, বিবিএসের সঙ্গে তাদের এই যৌথ প্রয়াস দেশের পরিসংখ্যানগত অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রূপান্তর করতে সাহায্য করছে। কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ২০২৭ সালের মধ্যে বিবিএস মাইক্রোডাটা ক্যাটালগ ও অনলাইন আবেদন সুবিধাসহ আরও কিছু আধুনিক সেবা চালু করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে যেমন উচ্চমানের গবেষণা উৎসাহিত হবে, ঠিক তেমনি সরকারি পরিসংখ্যান থেকে আড়াল দূর করে জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা আবার পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।

এসআর/এসএএস/এমএসএ