মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং আমেরিকা-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় গত মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মোট ১৭ হাজার ৩৯ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যতটা দাম বেড়েছে, সরকার জনস্বার্থে দেশের বাজারে সেই তুলনায় দাম বৃদ্ধি করেনি। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে সহনীয় পর্যায়ে আসলে দেশের বাজারেও মূল্য কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
সোমবার (২২ জুন) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মাদ আব্দুল খালেকের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এসব তথ্য জানান। এদিন প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। সাংসদ মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক তার প্রশ্নে বর্তমানে দেশে মজুত করা জ্বালানির পরিমাণ এবং তেলের দাম কমানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা তা জানতে চান।
জবাবে মন্ত্রী জানান, গত ১ জুনের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য মজুতের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের ২০২৪ সালে সর্বশেষ হালনাগাদ করা গ্যাস মজুতের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উত্তোলিত গ্যাসের পরিমাণ ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
একই সঙ্গে, ১০ জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মজুতের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে ডিজেল ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৯৯ মেট্রিক টন, অকটেন ৪৪ হাজার ৮৩ টন, পেট্রোল ১৯ হাজার ১৬৪ টন, ফার্নেস অয়েল ৭৬ হাজার ৭১২ টন, জেট ফুয়েল ৪১ হাজার ৩২৯ টন, কেরোসিন ১৩ হাজার ৯১৬ টন ও মেরিন ফুয়েল ১ হাজার ২৬ টনসহ দেশে মোট ৫ লাখ ২৯ হাজার ৫৬ টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে।
সংসদকে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য অধিক বৃদ্ধি পায়। মে মাস থেকে দাম কিছুটা হ্রাস পেতে শুরু করলেও তা এখনো আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে অনেক কম রয়েছে। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ফরমুলা অনুযায়ী গত এপ্রিল মাসের জন্য প্রতি লিটার ডিজেলের কস্টিং ১৫৫ দশমিক ৪৬ টাকা এবং অকটেনের কস্টিং ১৪৮ দশমিক ৯৩ টাকা হলেও সরকার ১৯ এপ্রিল থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকায় পুনর্নির্ধারণ করে।
তিনি আরও জানান, মে মাসের জন্য প্রতি লিটার ডিজেলের কস্টিং ২৩৪ দশমিক ৭৯ টাকা এবং অকটেনের কস্টিং ১৬৫ দশমিক ৫৬ টাকা হলেও সরকার মে মাসে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছিল। একইভাবে জুন মাসের জন্য প্রতি লিটার ডিজেলের কস্টিং ১৭৫ দশমিক ২২ টাকা এবং অকটেনের কস্টিং ১৬০ দশমিক ৭০ টাকা হলেও সরকার জনস্বার্থে চলতি জুন মাসেও ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি। তবে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্য লিটার প্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের মূল্য ১৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও দেশে মাত্র ১৫ শতাংশ এবং অকটেনের মূল্য ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও দেশে মাত্র ২১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনো ব্রেক-ইভেনের উপরে থাকায় ডিজেল ও অকটেন বিক্রয়ে বিপিসিকে দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী গত মার্চে ২ হাজার ২৪৮ দশমিক ৩৭ কোটি, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ দশমিক ০৩ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২৩ দশমিক ৩৪ কোটি এবং জুনের প্রথম ১১ দিনে ৪ হাজার ৩০১ দশমিক ৮২ কোটি টাকাসহ বিপিসির প্রকৃত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৩৯ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা। এই বিশাল লোকসান সত্ত্বেও, বিপিসি নিজস্ব তহবিল দিয়ে বিগত ৩ মাস ধরে জ্বালানি তেলের আমদানি কার্যক্রম সচল রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সহনশীল পর্যায়ে এলে দেশের বাজারেও দাম কমানো হবে।
এসআর/এসএএস/জেডএস
