বিজ্ঞাপন

চার বছরের চেষ্টায় জিডিআই-তে বাংলাদেশের ‘মন’ পাচ্ছে চীন?

চার বছরের চেষ্টায় জিডিআই-তে বাংলাদেশের ‘মন’ পাচ্ছে চীন?

প্রায় চার বছর ধরে নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর অবশেষে চীনের বহুল আলোচিত বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ বা জিডিআই-তে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেইজিংয়ের ধারাবাহিক চেষ্টা সত্ত্বেও ঢাকা এতে চূড়ান্ত সই করা থেকে বিরত ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরকালে এই উদ্যোগে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে যাওয়া হলেও, বাংলাদেশের শর্ত ও চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে চীনের প্রস্তাবের ধরন মিলে গেলেই কেবল উভয় পক্ষ এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকে সই করবে বলে জানা গেছে। 

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশ্ব নিয়ে ভাবনার অংশ হিসেবে চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ রয়েছে। এগুলো হলো- গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই), গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই) এবং গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ (জিজিআই)।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চীনের এই চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগের মধ্যে বাংলাদেশ শুধুমাত্র উন্নয়নকেন্দ্রিক জিডিআই-তে যুক্ত হতে পারে, বাকি তিনটিতে নয়।  

তিনি বলেন, জিডিআই নিয়ে আমরা ইতিবাচক এবং চীনও এটি চাইছে। আমরা যেভাবে যুক্ত হতে চাই, তাতে চীন রাজি হলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরেই চুক্তিটি হয়ে যাবে। কারণ, এটি সই করার মানসিকতা নিয়েই সরকার বেইজিং গেছে। তবে সই হওয়ার আগে নিশ্চিত করে বলা ঠিক হবে না, যদিও এবার চুক্তির সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

এর আগে গত শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিস্তারিত তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, চীনা প্রেসিডেন্টের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ সেগুলোতে যোগদানের বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এই সফরে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ রয়েছে এবং সেগুলোতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আমরা মোটামুটি বিবেচনা করছি। তবে আমরা ঠিক কয়টি উদ্যোগে যোগ দিচ্ছি বা দিচ্ছি না, তা সফর শেষেই নিশ্চিত করে বলা যাবে। কারণ বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তবে আমরা এটি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, আমরা এই চারটি উদ্যোগকেই সাধুবাদ জানাই। বিশ্ব নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই নতুন চিন্তাভাবনাকে আমরা প্রশংসনীয় উদ্যোগ মনে করি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, জিডিআইয়ে বাংলাদেশকে যুক্ত করার চেষ্টা চীন বহুদিন ধরেই করে আসছে। আমরা ইতোমধ্যে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত আছি, যা মূলত জিডিআইয়েরই অংশ। তাই জিডিআইয়ে আমাদের যুক্ত হতে কোনো বাধা দেখছি না এবং সরকারও বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে চীনের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভে (জিএসআই) আমাদের যাওয়া ঠিক হবে না।

এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন গত এপ্রিলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে ‘ফ্রেন্ডস অব জিডিআই’ জোটে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১০০টি দেশ, অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক সংস্থা চীনের সঙ্গে জিডিআই সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বের অনেক দেশ সরাসরি জিডিআইয়ে যুক্ত না হলেও ‘ফ্রেন্ডস অব জিডিআই’তে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অর্থ হলো, তারা এই উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফর শুরু করেন তারেক রহমান। দেশটিতে দুই দিনের সফল সফর শেষে পাঁচ দিনের সরকারি সফরে সোমবার (২২ জুন) রাতে তার চীনে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সফরের প্রথম অংশে চীনের দালিয়ানে গিয়ে পরবর্তী দুই দিন তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনের বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেবেন। এরপর ২৪ থেকে ২৬ জুন বেইজিং সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরসূচি অনুযায়ী, ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ২৬ জুন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বেইজিং সফরে চীনের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

জিডিআই এবং বাংলাদেশ

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের (জিডিআই) ঘোষণা দেন। এরপর ২০২২ সালের আগস্টে ঢাকা সফরকালে চীনের তৎকালীন ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই প্রথম বাংলাদেশকে জিডিআই ও জিএসআইয়ের মতো উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। সেই সঙ্গে এই সংক্রান্ত একটি ৩২ দফার খসড়া দলিলও (ডকুমেন্ট) বাংলাদেশের কাছে সরবরাহ করা হয়।

সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমনকি শীর্ষ নেতাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জিডিআইয়ে যুক্ত হতে নানাভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন কূটনৈতিক কৌশলে এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকে।

২০২৩ সালে চীন সরকার জিডিআই-বিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান তাতে অংশ নেন। সম্মেলন শেষে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে একটি সমাপনী বিবৃতি প্রকাশের উদ্যোগ নেয় বেইজিং। সেখানে বাংলাদেশের সম্মতি চাওয়া হলে তৎকালীন সরকার মনে করে, বিবৃতির ভাষা ঠিক থাকলেও এর প্রেক্ষাপট ঠিক নেই।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার জিডিআই প্রস্তাবটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশ এই উদ্যোগে সই করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ এতে যুক্ত না হওয়ায় বেইজিং প্রকাশ্য অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।

এরপর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে বেইজিং যান তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সেই সফরেও যথারীতি জিডিআই প্রসঙ্গটি সামনে আনে বেইজিং। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের এজেন্ডায় প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের তালিকায় জিডিআই চুক্তিটি অন্তর্ভুক্ত করে চীন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারও শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগে সই করেনি; যদিও জিডিআই বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থানের চেয়ে ভাষাগত ও নীতিগত জায়গায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

এনআই/এমএসএ