বিজ্ঞাপন

ছেলেকে বিদায় নয়, শেষ বিদায় জানাতে দেশে রইলেন মা

ছেলেকে বিদায় নয়, শেষ বিদায় জানাতে দেশে রইলেন মা

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান। ১২ জুন দুবাই যাওয়ার ফ্লাইট ধরার কথা ছিল মা তানিয়া শিকদারের। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর আবার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই যাত্রা আর হয়নি। ভোরের আলো ফোটার আগেই আসে হৃদয়বিদারক সংবাদ। পূর্ব শত্রুতার জেরে হামলায় গুরুতর আহত হয় একমাত্র ছেলে সাজিদ চৌধুরী রাফি। ১৩ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২২ জুন) সকালে আইসিইউতে মারা যান একমাত্র ছেলে সাজিদ।

মায়ের দুবাইয়ের টিকিট ছিল। কিন্তু, বিমানবন্দরের পথে নয়, সেদিন তাকে ছুটতে হয়েছে ঢামেক হাসপাতালে। যে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বিদায় দেওয়ার কথা ছিল, সেই ছেলেকেই শেষ বিদায় জানাতে হয়েছে মা তানিয়া শিকদারের।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর রাজধানীর মিরপুরের ইব্রাহিমপুর এলাকায় বাবার সঙ্গেই বসবাস করতেন রাফি। মা কর্মসূত্রে দুবাইয়ে থাকলেও ছেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। দূরদেশে থেকেও ছেলেকে ঘিরেই ছিল তার সব স্বপ্ন, সব পরিকল্পনা।

ঢামেক হাসপাতালের মর্গে কথা হয় নিহত রাফির মা তানিয়া শিকদারের সঙ্গে, ‘রাফিই ছিল আমার একমাত্র সন্তান। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছিলাম। ছয় বছর ধরে দুবাইতে থাকি। ছেলেকে মানুষ করার জন্য বছরের পর বছর নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছি। রাফির বাবার সঙ্গে আমার অনেক আগেই বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। ছোটোবেলা থেকেই রাফি আমার কাছে থাকতো। আমি দেশের বাইরে যাওয়ার পর এখন বাবার সঙ্গেই থাকে। কিন্তু, সেই সন্তানের লাশ দেখতে হবে, এমন দুঃস্বপ্ন কখনও কল্পনাও করিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার বাবা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পরেও তার কোনো অনুভূতি নেই। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তারা মাদক ব্যবসায়ী। পারভেজ এবং কাল্লু একসময় রাফিদের বাসায় ভাড়া থাকতো। মাদক ব্যবসা করে জানতে পেরে তাদেরকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিল। রাফিদের ওখানে একটি একতলা বাড়ির কাজ চলছে, সেখানে তারা আড্ডা দিত। তাদের ওখানে যেতে রাফি নিষেধ করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে মাদকের বিভিন্ন মামলা রয়েছে থানায়। এই নিয়ে রাফির সঙ্গে ঝগড়াও হয় কাল্লুর। সেই ক্ষোভে তারা আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। এ ছাড়া, রাফিদের সঙ্গে তার চাচার জমিজমাসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল। হত্যার পেছনে এই দুটি কারণ থাকতে পারে। এই দেশে আমার একমাত্র ছেলের হত‍্যার কি বিচার পাব? মনে হয় না। আমার ছেলে হত্যার বিচার আল্লাহর কাছে দিয়ে রেখেছি।’

এদিকে, নিহত রাফির ফুফু ইতি জানান, ‘আমার দুইটি ভাই। রাফির বাবা দীর্ঘদিন যাবৎ মানসিক ভারসাম্যহীন। রাফি তার চাচাদের সঙ্গেই থাকে। হত্যাকারীরা আগে রাফিদের বাসায় ভাড়া থাকতো। পরে তাদেরকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। হত্যাকারীদের সঙ্গে এই নিয়ে আগে তার বিরোধ ছিল। পরবর্তী সময়ে হত্যাকারীরা নির্মাণাধীন ভবনে ফাঁকা জায়গায় এসে আড্ডা দিত। রাফি তাদের নিষেধ করায় এই নিয়ে রাফির সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। ওইদিন রাতেই পরিকল্পিতভাবে তারা রাফির মাথায় ইটের আঘাত করে ছিনতাইয়ের একটি নাটক সাজায়। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার ভাতিজা হাসপাতালে মারা যায়।’

মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. হাসিবুর রহমান বলেন, ‘পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় আমরা সরাসরি জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছি। এখনো একজনকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান চলছে।’
 
এই হত্যাকাণ্ডটি শুধু পূর্ব শত্রুতা নাকি নিহতের চাচাদের সঙ্গে জমিজমাসংক্রান্ত কোনো ঘটনা আছে কিনা, ‘তদন্তে এমন কিছু পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত পূর্ব শত্রুতার জের ছাড়া কিছুই পাইনি। গ্রেপ্তার করা আসামিদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা জানতে পেরেছিলাম, ভয় দেখিয়ে গাড়ি থামিয়ে তাকে শাসানোর কথা। কিন্তু, হিট অফ দা মোমেন্টে ইট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে আহত করা হয়। আপনারা দেখেছেন, ইট দিয়ে আঘাত করে তারা উপর থেকে ইট পড়েছে এমন একটি নাটক সাজায়। পরে তারাই আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে রাফি মারা যান।’

উল্লেখ্য, এর আগে ৯ জুন রাত সোয়া ১টার দিকে পূর্ব শেওড়াপাড়া দিয়ে মোটরসাইকেলে বাসায় ফিরছিলেন রাফি। আগে থেকে ওত পেতে থাকা একজন তাকে থামার সংকেত দেন। তিনি না থামলে আরেকজন চলন্ত মোটরসাইকেলে ইট ছুড়ে আঘাত করেন। এতে রাফি রাস্তায় পড়ে যান। এ সময় আঘাতকারী ব্যক্তি চিৎকার করে বলে, উপর থেকে ইট পড়েছে, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। সে নিজেই ইট দিয়ে আঘাত করে তাকে গুরুতর আহত করার পর চিৎকার করে আশপাশের লোকজনের কাছে হেল্প চায়। পরে তাকে একটি অটোরিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই এটিকে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনা বলে মনে করেছিলেন। পুলিশও প্রথমে সেই দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত শুরু করে। তবে তদন্তে পরে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, হামলাকারীরা রাফির পূর্বপরিচিত।

ঘটনার দিন রাফি একা মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্ত কালু, পারভেজসহ কয়েকজন সহযোগী ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন। রাফিকে একা পেয়ে তারা তাকে আটকের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে কালু তাকে থামাতে ব্যর্থ হলে সামনে অবস্থান নেওয়া পারভেজ একটি বড় ইটের টুকরো দিয়ে রাফির মাথায় আঘাত করেন। এতে তিনি মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গুরুতর আহত হোন। পরে অভিযুক্তরাই আহত রাফিকে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

এসএএ/এসএএএ/এমএসএ