বিজ্ঞাপন

সংসদের অন্যরকম দিন

আম কূটনীতি থেকে ভারত সম্পর্ক ও জ্বালানি খাতে লোকসানের খতিয়ান

আম কূটনীতি থেকে ভারত সম্পর্ক ও জ্বালানি খাতে লোকসানের খতিয়ান

চলমান বাজেট অধিবেশনের উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহাওয়ার মাঝেই জাতীয় সংসদ ভবনে সোমবার (২২ জুন) এক অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমী সৌজন্যতার দৃশ্য দেখা গেছে। কোনো রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক বা আইন পাসের ব্যস্ততা নয়, বরং বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে সাধারণ পিয়ন ও ঝাড়ুদারসহ সবার জন্য পাঠানো ‘১০ কেজির আমের সারপ্রাইজ’ উপহার ঘিরে মুখরিত ছিল গোটা সংসদ সচিবালয়।

তবে এই আম কূটনীতির মধুর আবহের মধ্যেও সংসদের মূল অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের স্থায়িত্ব, জামায়াতের মিছিলকে ‘মবক্রেসি’ বলা নিয়ে বিতর্ক, মসজিদ-মাদ্রাসায় রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি, গুজব রুখতে ২৪ ঘণ্টার ফ্যাক্ট-চেকিং কমিটি এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতে বিপিসির ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর নানা তথ্য ও দাবি উঠে এসেছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, সকাল থেকেই সংসদ ভবনের করিডোরগুলোতে কৌতূহল ছিল ১০ কেজির এই বিশেষ সুদৃশ্য প্যাকেটের ভেতরে কী রয়েছে। পরে জানা যায়, এতে ছিল মৌসুমী সুস্বাদু প্রিমিয়াম কোয়ালিটির আম। বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সংসদের প্রতিটি দপ্তরে গিয়ে এই উপহার পৌঁছে দেন। সাধারণত ভিআইপিরাই বিভিন্ন উপহার পেয়ে থাকেন, তবে ড. শফিকুর রহমানের এই উপহার তালিকায় সংসদের ঝাড়ুদার, পিয়ন, লিফটম্যান ও গাড়িচালকদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সবাইকে মুগ্ধ করেছে। 

উপহার পেয়ে আবেগাপ্লুত এক অফিস সহায়ক বলেন, ছোট চাকরি করায় বড় নেতাদের উপহার শুধু দূর থেকেই দেখতেন তারা, তবে আজ বিরোধীদলীয় নেতা নিজে তাদের কথা মনে রাখায় তারা সম্মানিত বোধ করছেন। বাংলাদেশের চেনা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্পর্কের বরফ যেখানে সহজে গলে না, সেখানে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এমপি জানান, রাজনীতি মাঠে থাকবে, কিন্তু সংসদের ভেতরে এই ধরনের সৌজন্যতাবোধ সত্যিই প্রশংসনীয় এবং এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এদিকে, বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মিছিল ও প্রতিবাদকে এক সদস্য কর্তৃক ‘মবক্রেসি’ হিসেবে অভিহিত করা নিয়ে আজ সংসদ অধিবেশনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম বিষয়টি স্পিকারের নজরে এনে এই আপত্তিকর শব্দটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে ‘এক্সপাঞ্জ’ বা বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানান। এই দাবির জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, এটি কোনো অশ্লীল শব্দ না এবং কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার মতো বিষয় নয়। তিনি সংশ্লিষ্ট সদস্যকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, যখন বাজেটের ওপর তার বক্তব্য দেওয়ার পালা আসবে, তখন তিনি যেন এই বিষয়ে ভালোভাবে বক্তব্য দেন।

পরবর্তীতে এই বিতর্কে অংশ নিয়ে খোদ বিরোধীদলীয় নেতা স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, 'মবক্রেসি' শব্দটা আসলে কোনো ভালো অর্থ বহন করে না এবং এটি নিশ্চিতভাবেই একটি আপত্তিকর শব্দ। সংশ্লিষ্ট সদস্য হয়ত খেয়াল না করে বেখেয়ালে এটি বলে ফেলেছেন উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাজেটের পর এই ধরনের প্রতিক্রিয়া বা আন্দোলন শুধু জামায়াতই করেনি, এর আগে বিএনপি বা অন্য দলসহ অনেকেই বহুবার করেছে; তাহলে কি অতীতের সেইসব গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াও ‘মবক্রেসি’ ছিল? এই শব্দটিকে সংসদে অত্যন্ত বেমানান আখ্যা দিয়ে তিনি এটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। বিরোধীদলীয় নেতার এমন আপত্তির মুখে স্পিকার তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, 'মবক্রেসি' শব্দটা এখন একটি সাধারণ বা কমন টার্মে পরিণত হয়েছে এবং ইদানীং প্রায় সবার বক্তৃতাতেই এটি শোনা যায়। এটি কোনো অশ্লীল বা অসংসদীয় শব্দ নয়। স্পিকার সদস্যদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, এটি মূলত রাজনীতিতে নিন্দনীয় ডেমোক্রেসির বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক শব্দ, যা আপনারা চাইলে আপনাদের বক্তব্যেও ব্যবহার করতে পারেন। ফলে সংসদে এটি এক্সপাঞ্জ হওয়ার মতো কোনো শব্দ নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন স্পিকার।

একই অধিবেশনে স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হতে পারে কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ডিভোর্স হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) সিরাজ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে আমরা একে অপরকে কখনোই অস্বীকার করতে পারি না, না ভারত পারবে, না বাংলাদেশ পারবে। তিনি সীমান্ত সংকট ও মাদক চোরাচালান বন্ধে ভারতের বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভারতে যা 'পুশ-ইন' আর বাংলাদেশের ভাষায় 'পুশব্যাক' হচ্ছে, তা বন্ধ হতে হবে এবং মানুষের হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।

একই সাথে জিএম সিরাজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে সংযত করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি অভিযোগ করেন, শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশ বিরোধী যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন তা দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, মাননীয় স্পিকার, আপনার মাধ্যমে আমি মোদি সরকারের কাছে আহ্বান জানাতে চাই, তারা যেন শুভেন্দু বাবুকে থামান। তিনি মাঝে মাঝে যে বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দেন, তা ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও মন্তব্য করেন এই বিএনপি সাংসদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তার আর কোনো ভূমিকা নেই। শেখ হাসিনা এখানে এখন অপ্রাসঙ্গিক। তাকে নিয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই, তিনি এখন বাংলাদেশে নেই এবং দৃশ্যপটের বাইরে চলে গেছেন।

অধিবেশনে দেশের জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বিশাল আর্থিক লোকসানের খতিয়ান তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মাদ আব্দুল খালেকের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং আমেরিকা-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় গত মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) মোট ১৭ হাজার ৩৯ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যতটা দাম বেড়েছে, সরকার জনস্বার্থে দেশের বাজারে সেই তুলনায় দাম বৃদ্ধি করেনি এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে সহনীয় পর্যায়ে আসলে দেশের বাজারেও মূল্য কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

জবাবে মন্ত্রী আরও জানান, গত ১ জুন তারিখের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের ২০২৪ সালে সর্বশেষ হালনাগাদকৃত গ্যাস মজুদের পরিমাণ ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত উত্তোলিত গ্যাসের পরিমাণ ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।

জ্বালানি তেলের মজুদের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে মোট ৫ লাখ ২৯ হাজার ৫৬ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনো ব্রেক-ইভেনের উপরে থাকায় ডিজেল ও অকটেন বিক্রয়ে বিপিসিকে দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এই বিশাল লোকসান সত্ত্বেও বিপিসি নিজস্ব তহবিল দিয়ে বিগত ৩ মাস ধরে জ্বালানি তেলের আমদানি কার্যক্রম সচল রেখেছে যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করছে।

বাজেট অধিবেশনের এই সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশে মসজিদ-মাদ্রাসায় সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মিটিং বন্ধে আইন পাস করার দাবি তুলেছেন কুষ্টিয়া-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ। তিনি বলেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর, সেখানে মানুষ নামাজ ও কোরআন শরিফ পড়বে, কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল মসজিদে গিয়ে রাজনীতি করছে, তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ, আইন পাস করে মসজিদ-মাদ্রাসায় রাজনৈতিক মিটিং নিষিদ্ধ করা হোক। তারা যেমন প্রকাশ্যে ফুটবল মাঠে, হাই স্কুলে কিংবা কোনো হলরুমে কর্মীসভা ও জনসভা করে মিটিং করে, তাদেরকেও সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্যদিকে, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ফ্যাসিস্টদের মতো দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এই শক্তিকে দেশের মাটিতে রাজনীতি করার অধিকার দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করছে, সেই দলটি ১৯৭১ সালে এদেশের সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল, তাই তিনি দাবি জানান তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না এবং তাদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করা হোক।

চলমান এই বাজেট অধিবেশনে সংসদ কক্ষে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রীদের আসন খালি থাকা নিয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এই সমালোচনা করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, তারা অনেক নোট করে এখানে আসেন, কিন্তু এখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেক মন্ত্রী উপস্থিত নেই এবং মন্ত্রীদের চেয়ার সব খালি পড়ে আছে।

সংসদ সদস্যের এই আপত্তির পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাজেট সেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেশন এবং তারা থাকলে সবাই বাধিত হবেন। এরপরই ফ্লোর নিয়ে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি সাফাই গেয়ে বলেন, অনেকে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকেন, তবে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আগাগোড়া এখানে উপস্থিত আছেন, কারণ বাজেট সংক্রান্ত সব বিষয়ে সকল কথার শেষ কথা গিয়ে অর্থমন্ত্রীই বলবেন।

তবে এই বাজেট অধিবেশনে ভিন্ন এক কৌতুকপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে যখন প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বাজেট নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি জামালপুর-২ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এ ই সুলতান মাহমুদ বাবু। অধিবেশনে তাকে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিতে শুরুতে সাত মিনিট সময় বরাদ্দ দেওয়া হলেও তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ শুরু করেন এবং একই সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রম ও নিজের নির্বাচনী এলাকার নানা প্রসঙ্গ টেনে কথা বলেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি স্পিকারের কাছে আরও কিছুটা সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানালে স্পিকার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি তো বাজেট নিয়ে কোনো কথাই বলেন নাই, দুই মিনিটে আপনার বক্তব্য শেষ করুন। স্পিকারের এমন মন্তব্যের পর সুলতান মাহমুদ বাবু বলেন, এলাকার মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পরে সময় পেলে কিংবা ৭১ বিধিতে কথা বলবেন।

এদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১২তম দিনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দেশের গণমাধ্যমের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে মোট ৫৯টি সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, ১৪৩৬টি দৈনিক পত্রিকা এবং ৪৭৪টি নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল রয়েছে। দেশের গণমাধ্যমের এই বিশাল পরিধির কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, ৫৯টি টিভি চ্যানেলের মধ্যে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৪টিসহ মোট ৩৯টি চ্যানেল তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দৈনিক পত্রিকার বিষয়ে মন্ত্রী জানান, সারাদেশ হতে বর্তমানে ১৪৩৬টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকা হতে ৫৯৩টি এবং অন্যান্য জেলা হতে ৮৪৩টি পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে তথ্য অধিদফতরের সদর দফতরে একটি বিশেষায়িত ‘গুজব প্রতিরোধ ও ফ্যাক্ট-চেকিং কমিটি’ ২৪ ঘণ্টা কর্মরত রয়েছে বলেও জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো অপপ্রচার বা গুজব ছড়ালে এই কমিটির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে সত্যতা নিশ্চিত করে ‘তথ্যবিবরণী’ এবং ‘প্রতিবাদলিপি’ সরকারি ও বেসরকারি সব গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে প্রেরণ করা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ ভবনের বিভিন্ন স্তরে ফাটল দেখা দেওয়া এবং বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার মতো অবকাঠামোগত ত্রুটি তৈরি হওয়ার বিষয়টির প্রতি দেশের এই সর্বোচ্চ আইন প্রণয়ন কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংসদে একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম রাশেদ সংসদের বৈঠকে এই নোটিশটি উত্থাপন করে ভবনের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান।

স্পিকার এই নোটিশটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরকে অনুরোধ জানান। দিনের কার্যসূচির শুরুতে জামায়াতের অপর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান একটি নোটিশের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের পরিচিতির বিষয়ে আরেকটি দাবি তুলে বলেন, টেলিভিশন স্ক্রিনে সংসদীয় কার্যক্রম সম্প্রচারের সময় শুধু চেহারা দেখা যায় ও বক্তব্য শোনা যায়, কিন্তু সংশ্লিষ্ট সদস্যের নাম বা নির্বাচনী এলাকা জানা যায় না। স্পিকার মুজিবুর রহমানের এই দাবিকে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত আখ্যা দিয়ে সংসদ সচিবালয়কে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এখন থেকে সংসদ সদস্যরা যখন বক্তব্য দেবেন, তখন টেলিভিশন স্ক্রিনে তাদের নাম ও নির্বাচনী এলাকা দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান।

এদিকে, নিজ নির্বাচনী এলাকায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালা। লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের চরম ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গভীর রাতেও মানুষ এমপিকে ফোন দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। এই সংকট দ্রুত সমাধান না করলে এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের মান-সম্মান নিয়ে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়বে। সংসদে বিদ্যুৎ মন্ত্রীর অনুপস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, মন্ত্রী থাকলে মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব চিত্র তাকে সরাসরি বুঝিয়ে বলা যেত। তিনি অবিলম্বে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জোর দাবি জানান।

বাজেট আলোচনার পাশাপাশি তিনি দেশের পাঠ্যপুস্তকেরও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ১৭ বছরে পাঠ্যপুস্তক থেকে হাজী শরীয়তউল্লাহ, শাহজালাল, শাহ পরান ও তিতুমীরের মতো ঐতিহাসিক ও বিপ্লবী পুরুষদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কাটছাঁট করে মুছে ফেলা হয়েছে। নিজের বংশের মহান পুরুষ হাজী শরীয়তউল্লাহর ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের কথা স্মরণ করে আগামী দিনের পাঠ্যপুস্তকে এই বীরদের ইতিহাস আবারও ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।

একই সাথে প্রবাসীদের ‘ফ্রিডম ফাইটার’ আখ্যা দিয়ে বিমানবন্দরে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের হয়রানি, পাসপোর্ট জটিলতা এবং এনআইডি না পাওয়ার সংকটের কথা তুলে ধরে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। প্রস্তাবিত বাজেটকে চমৎকার উল্লেখ করে এটি যেন টেকসই হয় এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি না হতে পারে, সেদিকে কঠোর নজর রাখার তাগিদ দেন এই সংসদ সদস্য।

এসআর/এমএন