ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ একজন সদস্য (মেম্বার) থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছেন বলে সংসদকে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া-২ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল গফুর। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এক আবেগঘন বক্তব্য দেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এসময় সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের গল্প শুনিয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, তিনি সবচেয়ে নিচু জায়গা থেকে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে এরপর চেয়ারম্যান, পরবর্তীতে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৯ সাল এবং এরপর থেকে এই দীর্ঘ রাজনৈতিক সফরে তার কোনো গ্যাপ ছিল না বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল গফুর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে উল্লেখ করলেও এটিকে একই সঙ্গে উচ্চাভিলাষী এবং অবাস্তবায়নযোগ্য বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই বাজেটে সুশাসনের চরম অভাব রয়েছে। বাজেটটি অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর এবং বিশেষ করে দেশীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কথা এখানে বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী তা মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হবে উল্লেখ করে এই লক্ষ্যমাত্রাকে অর্জন করা একেবারে অসম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে কুষ্টিয়া-২ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হলেও এর আগের বক্তাদের সূত্র ধরে তিনি ১৪ হাজার কোটি টাকার হিসাব মিলানো যায়নি বলে অভিযোগ তোলেন। এই বিশাল অঙ্কের টাকা কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। একই সঙ্গে তিনি তার নির্বাচনী এলাকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার জরাজীর্ণ অবকাঠামোর চিত্র তুলে ধরে বলেন, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা নেই এবং বৃষ্টির সময় চালের পানি থেকে নিজেদের খাতা-পত্র ও বসার স্থান রক্ষা করতে ওয়েল পেপার বা প্লাস্টিকের কাগজ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু বাজেটে এই ধরনের কতটি বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে মোহাম্মদ আব্দুল গফুর বলেন, তার নির্বাচনী এলাকার মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দুটিকে সরকার ইতোমধ্যে ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এই হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী ভর্তি থাকে এবং বহির্বিভাগে ১ থেকে দেড় হাজার রোগী সেবা নিতে আসে। বিশেষ করে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনের বেহাল দশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে রোগীরা তো বটেই, সুস্থ মানুষ গেলেও অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের এই দুরবস্থা দূর করতে তিনি অর্থমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পাশাপাশি ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তার এলাকার এক অসহায় দরিদ্র রোগীর দিনের পর দিন বারান্দায় পড়ে থাকার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশের গরিব মানুষ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে কোনো সঠিক সুবিধা ও সেবা পাচ্ছে না। চিকিৎসা খাতের এই অনিয়মগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর খতিয়ে দেখা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিজের এলাকার নদী ভাঙন সমস্যার কথা উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ভেড়ামারা ও মিরপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর একটি অংশের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। কিছুদিন আগে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন এবং তিনি নিজে পানি সম্পদ মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার জমা দিয়েছেন। গত বছর থেকেই ভেড়ামারার চারটি ইউনিয়ন নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙন রোধে অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
এছাড়া স্পিকারের অতীত অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে বর্তমান স্পিকার যখন পানি সম্পদ মন্ত্রী ছিলেন, তখন ওই এলাকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করেছিলেন, যার ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সংঘাত, রক্তপাত এবং হতাহত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, এই বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে সুশাসন এবং দুর্নীতি বন্ধ করা দরকার, তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা দিকনির্দেশনা প্রস্তাবিত বাজেটে রাখা হয়নি।
এসআর/বিআরইউ
