বিজ্ঞাপন

ধীরগতির বিচার নিয়ে জুলাই শহীদ মাতার আক্ষেপ, জবাব দিলেন আইনমন্ত্রী

ধীরগতির বিচার নিয়ে জুলাই শহীদ মাতার আক্ষেপ, জবাব দিলেন আইনমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যার বিচারকাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে বলে অভিযোগ তুলে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জুলাই শহীদের মাতা ও সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম। পাশাপাশি শহীদ পরিবার ও আহতদের সহায়তায় নিয়োজিত ‘শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এর কর্মীদের বেতন বকেয়া থাকা এবং আহতদের ভুল ক্যাটাগরিতে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগও সংসদে তুলে ধরেন তিনি। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রী ফ্লোর নিয়ে জানান, আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই বর্তমান সরকার জুলাই যোদ্ধাদের সব ধরনের রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করছে এবং প্রয়োজনে এই কাঠামোর ভেতরে আরও সুরক্ষা দিতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন রোকেয়া বেগম। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

রোকেয়া বেগম বলেন, গত ৫ আগস্ট তার ছোট ছেলে জাবির ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শাহাদাত বরণ করে। যখন তিনি ছেলেকে দেখছিলেন, তখন পুরো শরীর সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল এবং শরীরে এক ফোঁটা রক্তও অবশিষ্ট ছিল না। তার ছেলের মতো অসংখ্য শহীদের রক্ত ও বীর সন্তানের অঙ্গহানির আর্তনাদে এই জাতীয় সংসদ ভাসছে। দীর্ঘ ১৭ বছর নানা জুলুম-নির্যাতনের পর এই রক্তস্নাত জাতীয় সংসদে আবারও অধিবেশন চলছে যা জুলাই বিপ্লব না আসলে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। জুলাই শহীদ পরিবারগুলোর জন্য মাসিক ভাতা, আহত যোদ্ধাদের জন্য শ্রেণিভিত্তিক ভাতা এবং আবাসন সহায়তার জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখায় তিনি অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একজন বাবা বা মা সব সুযোগ-সুবিধার ঊর্ধ্বে তার সন্তান হত্যার বিচার চান এবং দৃশ্যমান বিচার ছাড়া ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলুপ্তি সম্ভব নয়।

সংসদে বিগত দিনের তথ্যের বরাত দিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যার ঘটনায় ৮০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে গত প্রায় দুই বছরে মাত্র সাতটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে, ২২টি সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে এবং ৫১টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। এই ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মামলাগুলোর ৪৬৩ জন আসামির মধ্যে মাত্র ১৭৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং এখনও ২৮৮ জন পলাতক রয়েছে। এই পলাতকদের গ্রেপ্তারের অগ্রগতি কী তা জানতে চেয়ে তিনি প্রতি সেশনে শহীদ সন্তানদের বিচার কাজের আপডেট জানিয়ে বাবা-মা'দের আশ্বস্ত করার দাবি জানান।

শহীদ ও আহতদের তালিকা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধার নানা বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে রোকেয়া বেগম বলেন, জুলাই বিপ্লবে শহীদের সংখ্যা হাজারেরও বেশি হলেও এ পর্যন্ত গেজেটভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৮৩৪ জনকে, বাকিদের তালিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পাশাপাশি আহত যোদ্ধাদের ক্যাটাগরি নির্ধারণে চরম জটলা ও ভোগান্তি চলছে। যার হাত চলে গিয়েছে সে কীভাবে ‘গ’ ক্যাটাগরিতে থাকে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি তদন্তের দাবি করেন। এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ১২০ কোটি টাকা সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণ করলেও গত তিন মাস ধরে এর কর্মীরা বেতন ও ঈদ বোনাস পাচ্ছেন না। তিনি এই ফাউন্ডেশনকে সরকারি আর্থিক কোডের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া, প্রতিশ্রুত অবশিষ্ট ২৬৩ কোটি টাকা ছাড় করা এবং একে আনুষ্ঠানিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে জুলাইয়ের ইতিহাস সংরক্ষণে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর এবং ডিজিটাল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার জন্য বাজেট বরাদ্দের অনুরোধ করেন। আন্দোলনে নারীদের অবদানের কথা স্মরণ করে তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির দাবিও জানান তিনি।

পরে সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ফ্লোর নিয়ে সংসদে বক্তব্য রাখেন আইনমন্ত্রী। আইনমন্ত্রী বলেন, যিনি শহীদ মাতা হিসেবে এখানে বক্তৃতা দিয়েছেন, তিনি আমাদের বিপ্লব ও সংগ্রামের প্রেরণার মূল চেতনা। তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, তা সংসদের প্রত্যেকেই ধারণ করে এবং তার প্রতিটা দাবি ও আবেগকে সরকার নিজের বলে মনে করে। তবে জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলেও রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া হয়নি, শহীদ মাতার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রতিটা আইনই আসলে একটি রাজনৈতিক দলিল এবং সরকারের পাবলিক পলিসি।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব, তা একমাত্র আইনি কাঠামোর মধ্যে এনেই বাস্তবায়ন করতে হয়। বর্তমান সরকার বিএনপির সরকার, জুলাই যোদ্ধাদের সরকার এবং জুলাই চেতনার সরকার। ফলে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনেই জুলাই যোদ্ধাদের যে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেটিই মূলত তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে। এর বাইরেও যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রয়োজন হয় এবং সংসদ সদস্য যদি তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তবে সরকার সেটিও আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

এসআর/বিআরইউ