চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চলমান প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), চট্টগ্রাম।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের নেতারা এ দাবি জানান।
নেতারা বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও বৈঠক করছে। তারা বলেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে দীর্ঘমেয়াদে হস্তান্তরের উদ্যোগ জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার পরিপন্থি।
তারা আরও বলেন, এনসিটি ও সিসিটি বাংলাদেশের জনগণের অর্থায়নে নির্মিত এবং বর্তমানে সম্পূর্ণ কার্যকর ও লাভজনক টার্মিনাল। এসব টার্মিনালে নতুন করে বড় ধরনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার পক্ষে যে বিনিয়োগ আনার যুক্তি দেখানো হচ্ছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
নেতাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে গেলে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তারা অভিযোগ করেন, জনগণ, শ্রমিক সংগঠন, বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী মহল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের উন্মুক্ত আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থি হবে। দেশের জনগণের সম্পদ ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় সংসদ, বিশেষজ্ঞ মহল ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া উচিত বলেও তারা মত দেন।
স্কপ নেতারা বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের সময় গৃহীত দেশবিরোধী ও জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে দেশপ্রেমিক শ্রমিক-জনতা তা মেনে নেবে না। জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো চুক্তি বা উদ্যোগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
বিবৃতিতে অবিলম্বে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ও সিসিটি ইজারা সংক্রান্ত সব আলোচনা ও চুক্তি প্রক্রিয়া বন্ধ, সরকারের অবস্থান জনসম্মুখে প্রকাশ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে রাখার দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে সই করেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন, স্কপের যুগ্ম আহ্বায়ক এস কে খোদা তোতন ও ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি খোরশেদুল আলম, বিএফটিইউসির সভাপতি কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, বিএমএসএফ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবসার, বিএলএফ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি রবিউল হক শিমুল, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা হেলাল উদ্দিন কবির এবং বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ উদ্দিন শাহীনসহ অন্য নেতারা।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমানে সবচেয়ে বড় টার্মিনাল এনসিটি প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা। এই টার্মিনালে একসঙ্গে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি জাহাজ ভেড়ানো যায়। এটিতে চারটি জেটি রয়েছে এবং বন্দরের মোট কনটেইনারের প্রায় অর্ধেক হ্যান্ডলিং করা হয় এই টার্মিনাল দিয়ে। এটিতে ব্যাকআপ ফ্যাসিলিটিজ হিসেবে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি সম্বলিত ইয়ার্ড। ২০০৭ সালে ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে এনসিটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি কি গ্যান্ট্রিক্রেনসহ আধুনিক ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে টার্মিনালে আরও ৫০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার স্থানান্তরের যত উন্নত যন্ত্র দরকার, সবই আছে টার্মিনালটিতে।
মোটা দাগে এই টার্মিনালে সব বিনিয়োগ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আওয়ামী লীগ আমলে তাদের নেতাদের ব্যবহার করে কোনো প্রকার বিনিয়োগ ছাড়াই টার্মিনালটি থেকে সাইফ পাওয়ার টেক হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। দেশি কিংবা বিদেশি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে তেমন সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এনসিটি থেকে বিতর্কিত সাইফ পাওয়ারটেককে সরিয়ে দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তখন থেকে বন্দর বিদেশিদের হাতে না দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন পক্ষ সরব হয়। আন্দোলনের মধ্যেই ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডকে।
আওয়ামী লীগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। তবে শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলন, ধর্মঘটে বন্দর প্রায় অচল হয়ে গেলে সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এরপর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর ফের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর এটি নিয়ে ফের সরব হয় বিভিন্ন পক্ষ। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে গত ৪ জুন জারি করা দুটি চিঠিকে ঘিরেই নতুন বিতর্কের সূত্রপাত। একটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নেওয়া অথবা আগ্রহ না থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তবে, একই স্মারক নম্বরে জারি করা অন্য চিঠিতে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এমআর/এসএএস
