বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি, মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয় সহজ করা, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি এবং সারাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার যুক্তিতে প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে সংস্থাটি। তবে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহ অবকাঠামোর কারণে বিপিসির ভেতরেই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে মতভেদ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশ বলছেন, বিপিসির মূল কার্যক্রম যেখানে, সেখান থেকে প্রধান কার্যালয় সরানো হলে তদারকি ও সমন্বয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আইন, ২০১৬ অনুযায়ী বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকার কথা। আইনটির ৫(১) ধারায় প্রধান কার্যালয়ের অবস্থান চট্টগ্রামে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ঢাকায় স্থানান্তর করতে হলে ওই ধারা সংশোধনের প্রয়োজন হবে। এর আগে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় ছিল। পরে ১৯৯০ সালে অধ্যাদেশ সংশোধন করে তা চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়।

বিপিসির আওতায় বর্তমানে ৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের ১৯টি জেলায় ডিপো এবং ৮ হাজারের বেশি ডিলারের মাধ্যমে সারাদেশে জ্বালানি তেল বিপণন করা হচ্ছে। সংস্থাটি মনে করছে, বর্তমান বাস্তবতায় বিপিসির প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী কাজের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রধান কার্যালয় ঢাকায় থাকলে কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
ঢাকায় নীতিনির্ধারণী কাজ, চট্টগ্রামে থাকবে অপারেশন
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুযায়ী প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়ে মতামত চাওয়া হলে বিপিসির বিভিন্ন বিভাগ বিষয়টি নিয়ে মত দেয়। সেখানে বলা হয়, মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠকগুলো সাধারণত ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। ফলে চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয় থাকায় কর্মকর্তাদের নিয়মিত ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করতে হয়।
বিপিসির মতে, বর্তমানে প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম অনেকাংশে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস থেকে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নেওয়া হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সহজ হবে।
অডিট আপত্তি নিষ্পত্তিকেও স্থানান্তরের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছে বিপিসি। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিপিসি ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর মে ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪০৯টি অডিট আপত্তি রয়েছে। এসব আপত্তির সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। বিপিসি বলছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং অডিট অধিদপ্তর ঢাকায় হওয়ায় প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হলে এসব কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তবে বিপিসির প্রস্তাবে চট্টগ্রামের অপারেশনাল কার্যক্রম চালু রাখার কথাও বলা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, তেলবাহী জাহাজ থেকে পণ্য গ্রহণ, পরিমাপ, ট্যাংকে সংরক্ষণ, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়নসহ মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম চট্টগ্রাম থেকেই পরিচালনা করা সম্ভব। এছাড়া ভবিষ্যতে মোংলা ও পায়রা বন্দরের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। পার্বতীপুরের মাধ্যমে ভারত থেকেও জ্বালানি আমদানি হচ্ছে। তাই ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করলে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে বলে মত দিয়েছে বিপিসি।

বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির অংশ হিসেবেই ১৯৯০ সালে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে আনা হয়েছিল। কারণ সংস্থার মূল দায়িত্ব জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহ; যার বড় অংশই চট্টগ্রামকেন্দ্রিক।
তারা বলছেন, আমদানি করা অপরিশোধিত তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। পরে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মাধ্যমে সারাদেশে সরবরাহ করা হয়। বিপিসির আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোও চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাস, সংরক্ষণ ও সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাশাপাশি মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পসহ বড় জ্বালানি অবকাঠামো চট্টগ্রাম অঞ্চলে থাকায় প্রধান কার্যালয় এখানেই থাকা যৌক্তিক।
এছাড়া চট্টগ্রামে বিপিসির নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। নগরের জয়পাহাড় এলাকায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ভাড়ায় কার্যক্রম চালানোর পর নিজস্ব ভবন নির্মাণের পরপরই প্রধান কার্যালয় সরানোর আলোচনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
তবে বর্তমানে প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকলেও বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই নিয়মিত ঢাকার কারওয়ান বাজারের লিয়াজোঁ অফিসে বসে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন। ফলে চট্টগ্রামের কর্মকর্তাদের সভা, ফাইল অনুমোদন ও সমন্বয়ের জন্য নিয়মিত ঢাকায় যেতে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতে বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একজন কর্মকর্তার প্রতিবার যাতায়াতে প্রায় ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে মাসিক এ ব্যয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
জানা গেছে, বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের আলোচনা নতুন করে শুরু হয় জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধির একটি নোটিশের পর। কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী গত ১২ মে সংসদে এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে মতামত চাওয়া হয়।
যদিও গত ২৯ মে চট্টগ্রামে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে সরানো হবে না।
এ বিষয়ে বিপিসির জানতে বিপিসির চেয়ারম্যানকে কয়েকদিন ধরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর সংস্থাটির সচিব শাহিনা সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, তেল খালাস, সংরক্ষণ, পরিশোধন ও সরবরাহের পুরো অবকাঠামো চট্টগ্রামকেন্দ্রিক, সেখানে বিপিসির শীর্ষ কর্তাদের ঢাকায় বসে কার্যক্রম চালানোটা একেবারে অযৌক্তিক। এখন আবার তাদের সুবিধার জন্য বিপিসির কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটি সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতিরও পরিপন্থি। দ্রুত শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়মিত চট্টগ্রামে অফিস নিশ্চিত এবং প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগ থেকে সরে আসার দাবি জানাচ্ছি।
এমআর/এসএম
