বিজ্ঞাপন

‘স্বাস্থ্য খাতে ৮০ হাজার পদ খালি, রোগীর গচ্চা দেড় লাখ কোটি টাকা’

‘স্বাস্থ্য খাতে ৮০ হাজার পদ খালি, রোগীর গচ্চা দেড় লাখ কোটি টাকা’

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোকে স্বাগত জানালেও এই খাতের নানামুখী সংকট ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে জাতীয় সংসদে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোসলেহউদ্দিন ফরিদ। 

মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার পদ খালি পড়ে রয়েছে। একইসঙ্গে চিকিৎসা নিতে গিয়ে জনগণকে প্রতি বছর নিজেদের পকেট থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে, যা দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না; তীব্র জনবল সংকট, ওষুধের বাজারে নিয়ন্ত্রণের অভাব, বিকল যন্ত্রপাতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা দূর করা না গেলে সাধারণ মানুষ বাজেটের প্রকৃত সুফল পাবে না।

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এমপি ফরিদ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, চিকিৎসা উপকরণের ওপর কর কমানো এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা অবৈতনিক করার সরকারি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। তবে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দকে ইতিবাচক বললেও একে অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত জিডিপির ৫ শতাংশ, কারণ আশপাশের অনেক দেশই ইতোমধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বাংলাদেশকেও ধীরে ধীরে সেই পথেই।

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে জনবল ঘাটতির বিষয়টি বিশদভাবে তুলে ধরেন মোসলেহউদ্দিন ফরিদ। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র ১৮ শতাংশ স্বাস্থ্য জনবল নিয়োজিত রয়েছে। এই তীব্র সংকটের ওপর আবার অনেক স্বাস্থ্যকর্মী গ্রামীণ এলাকা বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবস্থান করেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা এবং চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের কর্মস্থলে ধরে রাখতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এই সংসদ সদস্য।

জনগণের চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ে চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের স্বাস্থ্য বাজেট যদি ৬৯ হাজার কোটি টাকা হয়, তার বিপরীতে জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই খরচের মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকাই চলে যাচ্ছে ওষুধ কিনতে এবং ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখার প্রবণতা ঠেকাতে এবং ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি জোরদার করার তাগিদ দেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ৫০ শতাংশের বেশি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সামান্য মেরামতের অভাবে হাসপাতালগুলোতে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এসব যন্ত্রপাতি দ্রুত সচল করা গেলে গরিব রোগীদের বাইরে গিয়ে চড়া মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর ভোগান্তি ও খরচ অনেক কমে আসবে।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-৩ অর্জন করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে স্মরণ করিয়ে দেন এমপি ফরিদ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, পরিচালন খাত থেকে ২ হাজার কোটি টাকা এবং প্রকল্প খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে না পেরে ফেরত যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এই অবস্থায় তিনি স্বাস্থ্য খাতে নিবিড় গবেষণা এবং আমূল কাঠামোগত সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি মন্তব্য করেন, শুধু কাগুজে বরাদ্দ বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না, বরং খাতের মূল সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তা সমাধান করলেই কেবল সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে।

এসআর/জেডএস

বিজ্ঞাপন