বিজ্ঞাপন

নিয়ম ভেঙে কাফকোর টেন্ডার বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে

নিয়ম ভেঙে কাফকোর টেন্ডার বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে

জনবল সরবরাহের টেন্ডার প্রক্রিয়া ঘিরে দেশের অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে (কাফকো) অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। আর্থিক ও প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাফকো সূত্র ও দরপত্র নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ই-প্রকিউরমেন্ট প্ল্যাটফর্ম আরিবার মাধ্যমে গত মার্চে টার্ন অ্যারাউন্ড-২০২৬ উপলক্ষ্যে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে কাফকোর রাঙ্গাদিয়া প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন ইউনিটে বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে বিপুলসংখ্যক অস্থায়ী শ্রমিক ও দক্ষ টেকনিক্যাল জনবল নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে, যা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে সার কারখানা, ভারী রাসায়নিক শিল্প বা প্রসেস ইন্ডাস্ট্রিতে টার্ন অ্যারাউন্ড কিংবা বড় ধরনের শাটডাউন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে জনবল সরবরাহের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা, পূর্ববর্তী কাজের রেকর্ড এবং শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা থাকা আবশ্যক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এই দরপত্রে মোট তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে আর এস এন্টারপ্রাইজ প্রতি ইউনিট শ্রমিক সরবরাহের জন্য ৪ টাকা ৯৮ পয়সা দর প্রস্তাব করে। শাহজাহান অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রস্তাব করে ১ টাকা ৮০ পয়সা এবং টিএসপি কমপ্লেক্স এমপ্লয়িজ অ্যান্ড ওয়ার্কার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড প্রস্তাব করে ২ টাকা ৯৯ পয়সা।

প্রাথমিক মূল্যায়নে শাহজাহান অ্যান্ড ব্রাদার্সকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক দক্ষিণ জেলা যুবদলের সভাপতি মো. শাহজাহান। অভিযোগকারীদের দাবি, এত কম দর বাস্তবসম্মত নয় এবং এই দরে প্রকল্প পরিচালনা করলে কাফকোর নির্ধারিত অর্থ কাঠামোর মধ্যে শ্রমিক পারিশ্রমিক, প্রশাসনিক ব্যয় ও অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব নয়।

তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু সর্বনিম্ন দর নয়, বরং দরটির বাস্তবায়নযোগ্যতা, বাজারদর অনুযায়ী সামঞ্জস্য এবং আর্থিক টেকসইতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই মূল্যায়ন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া, ভ্যাট, ট্যাক্স ও অন্যান্য আইনগত খরচ যুক্ত করলে ১ টাকা ৮০ পয়সার দর কার্যত লোকসানজনক অবস্থায় পড়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে এই কাজ বাস্তবায়ন করবে এবং শ্রমিকদের মজুরি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ব্যয় কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। অন্য দিকে, আর এস এন্টারপ্রাইজের ৪ টাকা ৯৮ পয়সার দর তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ায় তা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতামূলক দর হিসেবে পিছিয়ে পড়ে।

দরপত্রটি এক ধাপের দুই খাম পদ্ধতিতে নেওয়ার কথা ছিল। এই পদ্ধতিতে প্রথমে কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং পরে আর্থিক প্রস্তাব যাচাই করার নিয়ম রয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, এই কাঠামো অনুসরণ করা হলেও কার্যত কারিগরি সক্ষমতা ও আর্থিক বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ যথাযথভাবে হয়নি। এ ছাড়া, অভিযোগ উঠেছে যে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাফকোর এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়মানুযায়ী টিএসপি কমপ্লেক্স এমপ্লয়িজ অ্যান্ড ওয়ার্কার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড কাজ পেয়েছিল। তবে রাজনৈতিক প্রভাব না থাকায় প্রতিষ্ঠানটিকে শেষ পর্যন্ত ওয়ার্ক-অর্ডার দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। তবে একপর্যায়ে রাজনৈতিক চাপে সম্প্রতি শাহজাহান অ্যান্ড ব্রাদার্সকে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কাফকোর নিয়মানুযায়ী দৈনিক অদক্ষ শ্রমিক পাবে ১ হাজার ১০০ টাকা, জেনারেল ফিল্টার ১ হাজার ৩০০ টাকা, ওয়েল্ডার ২ হাজার ১০০ এবং ইলেকট্রিক্যাল পাবে ১ হাজার ৪০০ টাকা। এখন যে প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে, তারা শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি না দিয়ে তাদের কাছ থেকে বেতনের উল্লেখযোগ্য অংশ কেটে রাখবে। যেটি কাফকোর নিয়মের পরিপন্থি।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর থেকে কাফকোর বেশিরভাগ টেন্ডারই নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবদল নেতা শাহজাহান। বর্তমানে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কাফকোতে ক্যাজুয়াল শ্রমিক সাপ্লাই, পরিচর্যার কাজ ও কেমিক্যাল পরিবহনের কাজ করছে।

অভিযোগের বিষয়ে শাহজাহান অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী ও দক্ষিণ জেলা যুবদলের সভাপতি শাহজাহান ঢাকা পোস্টকে বলেন, কোনো কোনো কাজ লোকসানে করতে হয়। আমিও এটা লোকসানে করছি। তা ছাড়া, আমি অতীতে কাজ করেছি, বিধায় একটা সেটআপ আছে। এ হিসেবে আমি কাজটি নিয়েছি।

এ বিষয়ে কাফকোর মহাব্যবস্থাপক (প্রকিউরমেন্ট) ফারুক আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, যারা কম দাম দিয়েছে, আমরা তাদের কাজ দিয়েছি।

তবে লোকসানে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে কাজ করবে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হোননি।

কাফকো দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকার ও জাপানসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিচালিত একটি যৌথ উদ্যোগ। দেশের কৃষি খাতে সার সরবরাহে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উৎপাদন ইউনিটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, শাটডাউন ও টার্নঅ্যারাউন্ড কার্যক্রমের জন্য প্রতি বছরই বড় পরিসরে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়, যা পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এমআর/এসএএস/এনএফ