জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব আদায় ও দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণের সর্বশেষ তথ্যচিত্র তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (২৪ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ এবং জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের পৃথক দুটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনার নানা চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবিলায় সরকারের নতুন পরিকল্পনার কথাও সংসদকে অবহিত করেন মন্ত্রী।
এক বছরে নতুন করদাতা সাড়ে ১৪ লাখ, এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব আদায় ৩.২৭ লাখ কোটি টাকা
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছরে নিবন্ধিত রাজস্বদাতার সংখ্যা যেখানে ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৬৫, সেখানে চলতি অর্থবছরে তা ১১.৮৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৬-এ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৯২১টি নতুন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রাজস্ব ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কর-জাল সম্প্রসারণ, নতুন করদাতা শনাক্তকরণ এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা বাড়ানোর কারণে নিবন্ধিত রাজস্বদাতার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের সার্বিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাময়িক হিসাবে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা, যা এপ্রিল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৮২.৪৯ শতাংশ।
বিদেশি ঋণ ৭৮ হাজার মিলিয়ন ডলার ছাড়াল, বাড়ছে সুদ-আসল পরিশোধের দায়
রাজস্ব আদায়ের ইতিবাচক ধারার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক ঋণের একটি বড় চাপের চিত্রও সংসদে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, গত মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ২২৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বিপুল পরিমাণের এই ঋণের মধ্যে ৬১.৯৭ শতাংশ রয়েছে কনসেশনাল বা সহজ শর্তের ঋণ এবং বাকি ৩৮.০৩ শতাংশ নন-কনসেশনাল বা কঠিন শর্তের ঋণ। বিশ্বব্যাংকের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার কারণে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসছে। একই সঙ্গে বিগত বছরগুলোতে সরকারের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় অনেকটাই বাড়বে।
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে লাগাম, ঋণ ব্যবস্থাপনায় আসছে আইনি সংস্কার
বৈদেশিক ঋণের এই ক্রমবর্ধমান চাপ ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বেশ কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, এখন থেকে নতুন কোনো বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের আগে ঋণ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে, যেন উচ্চ সুদে কোনো অপ্রয়োজনীয় বা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা না হয়। শুধু উচ্চ অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করতে পারবে, এমন প্রকল্পগুলোকেই এখন বৈদেশিক ঋণের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পগুলোর সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে নিবিড় তদারকি শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই ও সহনশীল রাখতে সরকারের 'মিডিয়াম টার্ম ডেট ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি' হালনাগাদ করার কাজ চলছে এবং নিয়মিত 'ডেট সাসটেইনেবিলিটি অ্যানালাইসিস' করা হচ্ছে।
সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক গুণগত মান বাড়াতে খুব দ্রুতই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারের জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।
এসআর/বিআরইউ
