বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি কমাতে দেশের অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন এবং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের কাছে কার্যকরভাবে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সভাকক্ষে ‘বাংলাদেশে বজ্রপাত’ বিষয়ে আয়োজিত গোলটেবিল মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার।
আসন্ন আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস (২৮ জুন) উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা রাইমস এবং ইউনিসেফের সহায়তায় এ সভার আয়োজন করা হয়।
নিতাই চন্দ্র দে সরকার বলেন, কয়েক দশক আগেও দেশে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার অবস্থা অনেক দুর্বল ছিল। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হতো না। বর্তমানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় কিছু অনিশ্চয়তা থাকবেই, যা উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
তিনি জানান, আগে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় পাওয়া যেত, এখন দুই থেকে চার ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্দিষ্ট এলাকা বা লোকেশনভিত্তিক মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।
এ বিষয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরদের মাধ্যমে অবস্থানভিত্তিক বার্তা পাঠানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ লক্ষ্যে বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। তবে অপারেটরদের পক্ষ থেকে ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ১০৯০ নম্বর সেবাটি সব মোবাইল অপারেটরের জন্য টোল-ফ্রি করা হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বজ্রপাতসংক্রান্ত সতর্কবার্তা প্রচারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আইভিআর (ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স) এবং ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে টেলিটকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি বন্ধ হয়ে যায়নি। বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণার পর সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বজ্রনিরোধক দণ্ডের কার্যকারিতা সীমিত এলাকায় থাকে। তাই শুধু এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে কৃষকদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন এবং আগাম সতর্কবার্তা প্রচারের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি প্রাথমিক অনুমোদন পেলেও এখনও বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমানে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে দেওয়া সম্ভব হলেও তা মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে না পারলে এর সুফল পাওয়া যাবে না।
আগাম সতর্কবার্তা প্রচারে গণমাধ্যম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তথ্য পৌঁছাতে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
সভায় বজ্রপাত বিষয়ে প্রারম্ভিক বক্তব্য দেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু মহাশাখার উপপরিচালক ড. রাশেদুজ্জামান। রাইমসের ওয়েদার এক্সপার্ট থান মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী বজ্রপাত বিষয়ে একটি উপস্থাপনা দেন।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন উপপরিচালক মো. নুরুল করিম, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা।
আরএইচটি/এসএইচএ
