বিজ্ঞাপন

৪৮ শতাংশ আয়কর বৃদ্ধি মধ্যবিত্তের মরণফাঁদ : সংসদে আখতার হোসেন

৪৮ শতাংশ আয়কর বৃদ্ধি মধ্যবিত্তের মরণফাঁদ : সংসদে আখতার হোসেন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৪৮ শতাংশ আয়কর বৃদ্ধি মধ্যবিত্তের ওপরে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন রংপুর-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৫তম দিন (২৫ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা জানান। 

তিনি বলেন, মধ্যবিত্তের ওপর প্রথম যে আয়কর সেই আয়করের ওপরে ৪৮ শতাংশ আয়কর বৃদ্ধি করা হয়েছে—এটা একটা মধ্যবিত্তের ওপরে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

বিনিয়োগের পরিপন্থি বাজেট

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আমরা যদি আরও একটু ভেতরের দিকে তাকাই, এই বাজেটকে একটি বিনিয়োগ বান্ধব বাজেট বলা হচ্ছে। কিন্তু আমরা দেখতেছি সরকার ঋণ নিয়ে দেশের এই বাজেটটাকে সচল রাখার একটা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলো থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার মতো তারা ঋণ গ্রহণ করবে। সরকার যদি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ হবে না, প্রাইভেট সেক্টরে লোন ডিসবার্স হবে না এবং যার কারণে কিন্তু অর্থনীতি একটা স্থবির অবস্থায় এসে দাঁড়াবে, একটা ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি হবে। যার কারণে আমাদের এখানে বিনিয়োগ হবে না, কর্মসংস্থান হবে না। যে বাজেটটাকে বলা হচ্ছে বিনিয়োগ বান্ধব বাজেট, সেই বাজেটের মধ্যেই ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি করার মতো পদ্ধতি রেখে ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ সরকার আদায় করে নেবে, সরকার নিয়ে যাবে এবং তার কারণে এখানে প্রাইভেট সেক্টর যারা আছে, তারা কোনোভাবেই সেখান থেকে উপকৃত হবে না। এই কারণে এই যে একটা বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, সেই বাজেটটা বিনিয়োগ বান্ধব তো নয়ই বরং বিনিয়োগের পরিপন্থি একটা বাজেটে পরিণত হয়েছে।

মধ্যবিত্তের মরণফাঁদ

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আমরা যদি এই বাজেটের আয়করের দিকে একটু তাকাই, আয়করের ক্ষেত্রে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে—২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যেটা এখানে এটার উপর আয়কর বসানো হবে না। কিন্তু ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার উপরে যখনই যাবে, এর পরবর্তী ধাপের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ৩ লাখ টাকার জন্য ১০ পার্সেন্ট হারে সেখানে ট্যাক্স দিতে হবে। আমরা যদি এটা খেয়াল করে দেখি গত বছর কিন্তু এই পরিমাণটা ছিল ৫ পার্সেন্ট। কিন্তু এখন যখন এটা ১০ পার্সেন্ট করা হয়েছে, তখন এটা সরাসরি মধ্যবিত্ত যারা আছে, যারা অল্প ইনকাম করে তাদের ওপরে গিয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। কারণটা হলো কোনো একজন ব্যক্তি মাসে যদি ৩৫ হাজার টাকা ইনকাম করে থাকেন তাহলে বছর শেষে তাকে যে ট্যাক্সটা দিতে হচ্ছে তার পরিমাণটা আগে ৫ পার্সেন্ট হারে ছিল ৪২০ টাকা, এখন কিন্তু সেটা ৬২০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ এই মধ্যবিত্তের ওপরে প্রথম যে আয়কর সেই আয়করের ওপরে ৪৮ শতাংশ আয়কর বৃদ্ধি করা হয়েছে—এটা একটা মধ্যবিত্তের ওপরে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথের ফকির

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আমরা যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দিকে তাকাই, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরে অগ্রিম কর চার্জ করা হয়েছে। গ্রামের দোকানদার যারা আছেন তাদেরকে বলা হচ্ছে ০.২ পার্সেন্ট তাদেরকে কর দিতে হবে। এই ০.২ পার্সেন্ট কর কখন দেওয়া হবে? এটা অগ্রিম। অর্থাৎ যখনই তারা মালপত্র দোকানে নিয়ে আসছেন, ওই সময়টাতে যখন তারা ক্রয় করতেছেন ১০০০ টাকার মালপত্র যদি তারা তাদের দোকানে নিয়ে আসেন তখনই তারা সরকারকে দুই টাকা তাদেরকে কর দিতে হবে। অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত যে পণ্যটা বিক্রি করা হয়নি, সেই পণ্যটার ওপরেই বিক্রি করার আগেই কোনো লাভ হওয়ার আগেই যদি ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে ট্যাক্স এবং ভ্যাট আদায় করে নিয়ে আসা হয় তাহলে আমাদের যত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা আছে তারা পথের ফকির হতে আর দেরি হবে না। তাদেরকে রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

বাজেটে কৃষি ধর্তব্যের মধ্যেই নেই

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আমরা যদি আরও একটু ভালো করে কৃষি বাজেটের দিকে তাকিয়ে দেখি। কৃষিতে বাজেট এবার দেওয়া হয়েছে ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। গত বছরের বাজেট ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, এ বছরে এই বাজেটটা হয়েছে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। মাননীয় স্পিকার, আমরা একটা বাজেট করলাম যে বাজেটে গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা আমরা বৃদ্ধি করলাম, আর সেখানে আমরা কৃষি ক্ষেত্রে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করেছি—এটা বৃদ্ধি না করার নামান্তর, মাননীয় স্পিকার। আমাদের কৃষি সেক্টরটা নানাভাবে অবহেলিত হয়ে আছে। সরকারি দলের তরফ থেকে বলা হতে পারে যে সার-কীটনাশকের ওপরে যে সাড়ে সাত পার্সেন্ট ট্যাক্স এবং ভ্যাট ছিল সেটা উইথড্র করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সার এবং কীটনাশকের উপরে যে ভ্যাট এবং ট্যাক্সটা উইথড্র করে নেওয়া হয়েছে তাতে করে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকেরা কতটুকু লাভবান হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ, ব্যবসায়ীরা যারা আছেন তারাই এটার সুবিধাটা পেয়ে থাকেন। এই সার এবং কীটনাশকের ওপরে সরকার ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমানোর কারণে এটা যে আসলে সার এবং কীটনাশকের দাম কমবে, তা তদারকি কেমন করে হবে তা কিন্তু এখনও পর্যন্ত ঠিক করা হয়নি।

তিনি বলেন, কৃষি কার্ডের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের যেসব কৃষকেরা প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এটা কৃষিভিত্তিক একটা দেশ হওয়ার কথা ছিল আমাদের। ৭৫ সালের দিকে যেখানে আমাদের জিডিপিতে কৃষি ছিল ৬২, এখন সেটা ১০ থেকে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা কৃষিকে একেবারে ওভারলুক করে যাচ্ছি। এই বাজেটের মধ্যেও আমরা কৃষিকে একেবারে ধর্তব্যের মধ্যেই নিয়ে আসি নেই। আমরা মনে করি কৃষিতে বাজেট বাড়ানোর দরকার আছে এবং এটাই ১-১.৫ হাজার কোটি টাকা না, এটা এমন পরিমাণে বাড়াতে হবে, যাতে করে আমরা কৃষকদেরকে ভর্তুকির আওতায় নিয়ে আসতে পারি এবং আমরা সত্যিকারের অর্থেই তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি।

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আমাদের শিক্ষা বাজেটের মধ্যে যে তিনটা সেক্টরের কথা বলা হয়েছে, সেই তিনটা সেক্টরে এক ধরনের বাজেট আছে। সেখানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য যে বাজেটটা করা হয়েছে সেটার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে- শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এই যে অতিরিক্ত ১৪ হাজার কোটি টাকা, সেই ১৪ হাজার কোটি টাকা কোথায় খরচ করা হবে, সেটার কিন্তু কোনো ব্যবস্থাপনা এই জায়গার মধ্যে করা হয়নি। সেই একই বিষয়টা ঘটছে এডিপির ক্ষেত্রে। প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার যে এডিপি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই এডিপিতে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ গত বছর এবং তার আগের বছরে থোক বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১১ হাজার কোটি টাকা। ১০ হাজার কোটি টাকা ১১ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ এ বছরে এসে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ হয়েছে। এত বিশাল যে উল্লম্ফন হলো, সেই উল্লম্ফনের কারণে থোক বরাদ্দগুলো সঠিকভাবে ডিস্ট্রিবিউটেড হবে কি না, সেটা নিয়ে কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ আমরা দেখেছি ইতোমধ্যে সরকারি দল তারা যখন বরাদ্দগুলো বণ্টন করেছেন, তখন সরকারি দলের আসনগুলোতে তারা বরাদ্দ দিয়েছেন, বিরোধীদলের আসনগুলোতে তারা বরাদ্দ দেননি। সেক্ষেত্রে এডিপিতে যে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেই বরাদ্দটা সঠিকভাবে যে সারা দেশে সঠিক হিসাবের মাধ্যমে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বৈষম্যহীনভাবে ডিস্ট্রিবিউট করা হবে, তার গ্যারান্টি আমরা চাই।

সৌর বিদ্যুতে আবাসিক গ্রাহক, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উপকৃত হবেন না

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যে আমদানি শুল্ক ছিল, ভ্যাট ছিল এবং অগ্রিম কর ছিল, সেটা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেটা সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু যদি আমরা এনবিআরের এসআরওটার দিকে খেয়াল করে দেখি, যেটা কিছুদিন আগেই জারি করা হয়েছে, তাতে এই সুবিধাটা শুধু যারা বড় ব্যবসায়ী যারা আছেন এবং যারা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে সরকারের সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিভিত্তিক একটা ব্যবস্থাপনার মধ্যে আছেন তারাই শুধু লাভবান হবেন। কিন্তু যারা আবাসিক গ্রাহক আছেন, যারা কৃষক আছেন, ক্ষুদ্র যারা উদ্যোক্তা আছেন, তারা কিন্তু এটার মধ্য দিয়ে উপকৃত হবেন না। এই কারণে অর্থমন্ত্রীর কাছে আমরা এই বিষয়টা জানতে চাই যে আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ে যাতে একজন তরুণ যিনি একজন উদ্যোক্তা হয়েছেন, একজন কৃষক এবং একজন আবাসিক গ্রাহক তারাও যাতে নবায়নযোগ্য এই জ্বালানিতে ভ্যাট প্রত্যাহারের সেই সুবিধাটা পায়, সেই ধরনের একটা ব্যবস্থাপনা যেন করেন, সেই কারণে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অলস অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সংকট

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা যে খাতটা বৃদ্ধি করা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মধ্য দিয়ে আমরা যদি একটা অলস অর্থনীতি তৈরি করতে চাই তাহলে আমাদের জন্য দিন শেষে এটা ক্ষতির একটা কারণ হতে পারে। আমাদের এখনকার সংকট কর্মসংস্থানের সংকট। কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে শুধু যদি প্রণোদনার মধ্য দিয়ে জাতিকে স্থবির রাখার—অর্থাৎ জাতি তার কাছে কিছু প্রণোদনা দেওয়া হলো যেটা আবার সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে কি না তারও এখনো পর্যন্ত গ্যারান্টি নেই—আর কর্মসংস্থানের, বিনিয়োগের ব্যাপারগুলোতে যদি কমতি থেকে যায় সেক্ষেত্রে কিন্তু আমরা জাতিকে অগ্রসর করতে পারব না।

এমএসআই/বিআরইউ