দেশের অর্থনীতি সচল ও গতিশীল রাখতে কোটিপতিদের তোষণ বন্ধ করে প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক উপদেষ্টা ও হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া। তিনি বলেছেন, দেশের কোনো কোটিপতি বা ধনী মানুষকে অতিরিক্ত হাজার টাকা দিলে তা অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না। কিন্তু একজন গরিব মানুষকে মাত্র ১০০ টাকা দিলেও তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা বাজারে খরচ করেন, যা মূলত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
৪৫ বছরের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই অর্থনীতিবিদ দেশের বর্তমান ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিয়ে সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. রেজা কিবরিয়া অর্থনীতিতে আয়ের সুষম বণ্টনের (ইনকাম ডিস্ট্রিবিউশন) বাস্তবমুখী গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ধনী ব্যক্তিদের অতিরিক্ত এক বা দুই হাজার টাকা দিলে তারা হয়তো তা খরচই করবেন না; টাকা ব্যাংকে বা আলমারিতে জমা পড়ে থাকবে। কিন্তু প্রান্তিক বা গরিব মানুষের তাৎক্ষণিক খরচের প্রবণতা গ্রামীণ অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজারকে গতিশীল রাখে। তাই অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা উচিত।
প্রয়াত পিতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে শেখা একটি ঐতিহাসিক অনুপাতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একজন দিনমজুরের দৈনিক আয় এবং বাজারে সবচেয়ে সস্তা চালের দামের অনুপাত দেখলেই বোঝা যায় দেশের সাধারণ মানুষ কেমন আছে। উদাহরণস্বরূপ, দিনমজুরের দৈনিক মজুরি ১৪০ টাকা এবং সবচেয়ে সস্তা চালের দাম ২০ টাকা হলে, দিন শেষে তিনি অন্তত ৭ কেজি চাল কিনে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারবেন। যেকোনো জনবান্ধব সরকারের প্রতিনিয়ত এই সাধারণ হিসাবটির দিকে নজর রাখা উচিত, যা বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে উপেক্ষিত হচ্ছে।
সরকারের বিনিয়োগ নীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ড. কিবরিয়া। তিনি বলেন, দেশের টাকা দিয়ে শুধু বড় বড় শপিং মল কিংবা ৭ হাজার বর্গফুটের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা হলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে না। টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগকে অনুৎপাদনশীল খাত থেকে সরিয়ে সরাসরি উৎপাদনমুখী শিল্প বা কারখানা তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে। এতে প্রকৃত কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং গরিব মানুষের পকেটে টাকা পৌঁছাবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখবে।
দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ব্যাংকিং খাতের কর্মদক্ষতা অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে আমানত রেখে সৎ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদ আদায় করা হচ্ছে। আদর্শ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। চড়া সুদের কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছেন না।
ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপি হওয়ার নিয়ম বদলে ফেলার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আগে টানা ৯০ দিন সুদ পরিশোধ না করলে ‘খেলাপি’ হিসেবে গণ্য করা হতো। এখন এক বছর সুদ না দিলেও খেলাপি বলা যাচ্ছে না। এক বছর সুদ না দেওয়ার পরও খেলাপি না বলার এই ত্রুটিপূর্ণ ও মিথ্যা সংজ্ঞা ব্যবহারের পরও দেশে খেলাপি ঋণের হার ৬১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, বিশ্বের ৩৫টি দেশে তিনি কাজ করেছেন, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৬ শতাংশ পার হলেই অর্থনীতিবিদরা ঘাবড়ে যেতেন। আর বাংলাদেশে এই হার ৬১ শতাংশ হওয়া মানে দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
ড. রেজা কিবরিয়া জানান, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের পূর্বাভাসে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কমছে। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বাজেট তৈরি করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ খুব বেশি নয়; এটি জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ডেট সার্ভিসিং ২০ শতাংশের মতো। তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ঋণ নেওয়াটা হবে চরম বোকামি। এর চেয়ে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া শ্রেয়, কারণ এসব ঋণের সুদের হার আধা থেকে এক শতাংশের মতো অত্যন্ত কম থাকে এবং পরিশোধের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়।
মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে বিনিময় হারের (এক্সচেঞ্জ রেট) সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি যদি ১০ শতাংশ হয় আর প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের গড়ে ৩ শতাংশ হয়, তবে বিনিময় হার অবধারিতভাবে ৭ শতাংশ কমবে। তাই মুদ্রাস্ফীতি কম রাখাটাই দেশের অর্থনীতির জন্য শ্রেয়।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘ভুল ও মিথ্যা পরিসংখ্যান’ আখ্যা দিয়ে ড. কিবরিয়া বলেন, বাজেটে সাধারণত ৩ থেকে ৪ শতাংশ ঘাটতি দেখানো হয়। কিন্তু গত ১৫ বছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের হার কখনোই লক্ষ্যমাত্রার ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশের ওপরে যায়নি, কোনো এক বছরে তা ৭০ শতাংশও ছিল। উচ্চ রাজস্বের কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা ধরে বাজেট করার কারণে বছর শেষে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক, অ-ব্যাংক বেসরকারি খাত এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটাতে হয়। ব্যাংক থেকে সরকারের এই অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি তিনি দেশে সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।
এসআর/বিআরইউ
