বিজ্ঞাপন

ঋণের বোঝা এক লাখ কোটি বৃদ্ধি

সংসদে হাসনাতের পদত্যাগের চ্যালেঞ্জ ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল চিত্র

সংসদে হাসনাতের পদত্যাগের চ্যালেঞ্জ ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল চিত্র

সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাতারাতি ভাগ্যবদলের সমালোচনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সংসদ। সরকারি দলের সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামানের ঢালাও দুর্নীতির বক্তব্যের জবাবে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সরাসরি পদত্যাগের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। সরকারের সব গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্তে এক টাকার দুর্নীতি প্রমাণ হলে তিনি সংসদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দেন। রাজনৈতিক এই বাগ্যুদ্ধের পাশাপাশি অধিবেশনে বিগত চার মাসে দেশের ঋণের বোঝা ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন অরাজকতা এবং অকেজো চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসক সংকটের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের চরম বেহাল চিত্র ফুটে উঠেছে।

বাজেট অধিবেশনে সামগ্রিক অর্থনীতি, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও এর রাজনৈতিক ব্যবহার এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী শিবিরের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন।

অধিবেশনের শুরুতেই আলোচনার সূত্রপাত করে ময়মনসিংহ-১০ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান অভিযোগ করেন, দেশের একটি গোষ্ঠী জুলাই আন্দোলনের মহৎ চেতনাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত ব্যবসা এবং ভাগ্যবদলের হাতিয়ার বানিয়েছে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যারা জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে চলছেন, তাদের পূর্বের অর্থনৈতিক অবস্থা আর বর্তমান অবস্থার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এই ব্যক্তিদের অনেকেই আগে সাধারণ রিকশায় চড়তেন, কিন্তু এখন তারা বিলাসবহুল প্রাডোতে চড়ে ঘুরে বেড়ান। তারা এখন কেমন আলিশান বাসায় থাকেন এবং মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ করেন, তা এই জাতির সামনে পরিষ্কার হওয়া উচিত। আক্তারুজ্জামান বলেন, তারা নিজেরা এবং তাদের সন্তানেরাও জুলাইয়ের যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন এবং তারা এই চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেন; কিন্তু জুলাই কোনো বাজারে বিক্রি করার মতো বিষয় নয়।

পাশাপাশি আক্তারুজ্জামান প্রস্তাবিত বাজেটের প্রশংসা করে বলেন, বর্তমান বাজেটে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর দাম কমানো হয়েছে এবং মাত্র দুটি জিনিসের দাম বেড়েছে, যার একটি হলো সিগারেট এবং অন্যটি মদ। এই কারণে সারা দেশের মানুষ যখন এই বাজেটকে সানন্দে গ্রহণ করেছে, তখন বিরোধী দলের বন্ধুরা একে 'চানাচুর মার্কা বাজেট' বলে উপহাস করছেন। তিনি কিছুটা কৌতুক ও কটাক্ষের সুরে বলেন, চানাচুর সাধারণত বাচ্চারা খায়, তবে বড়রাও কখনো কখনো অন্য কিছু খাওয়ার পরে চানাচুর খেয়ে থাকেন; তাই বিরোধী দলের বন্ধুদের মন খারাপের কারণ অন্য কোথাও কি না, তা তার জানা নেই।

জুলাই বিপ্লব ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ইঙ্গিত করে দেওয়া এই বক্তব্যের পরেই সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এর তীব্র প্রতিবাদ জানান তরুণ সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। সরকারি দলের সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামানের এই বক্তব্যের জবাবে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি সরাসরি নিজের পদত্যাগের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

হাসনাত আব্দুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সংসদের মতো একটি পবিত্র জায়গায় তাদের উদ্দেশ্য করে ঢালাওভাবে এমন অভিযোগ বা ‘এলিগেশন’ আনা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। তিনি কোনো অস্পষ্টতা না রেখে সরকারকে আহ্বান জানান যেন দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডিজিএফআই, এনএসআই এবং পুলিশসহ যাবতীয় রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হয়। এই তদন্তে যদি তাদের বিরুদ্ধে মাত্র এক টাকারও দুর্নীতি কিংবা কোনো প্রকার অসদুপায়ের প্রমাণ মেলে, তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সংসদ থেকে ইস্তফা বা পদত্যাগ করবেন।

ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে গিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ স্পিকারের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, এর আগের একটি বক্তব্যে তার নাম ধরে কিছু বিভ্রান্তিকর কথা বলা হয়েছে। অথচ তিনি তার বক্তব্যের কোথাও এই শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করেননি যে ‘তাকে যেন ব্যক্তিগতভাবে বরাদ্দ বঞ্চিত না করা হয়’। তিনি মূলত বলতে চেয়েছিলেন, তার রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিশোধ হিসেবে যেন তার নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষকে কোনো উন্নয়নমূলক বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত করা না হয়।

ব্যাংকিং খাতের অরাজকতা ও ঋণের বোঝা

রাজনৈতিক এই বাগ্যুদ্ধের রেশ কাটার আগেই দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সম্পূর্ণ বেহাল দশা নিয়ে সংসদে এক বিধ্বংসী পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়া। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৮৪ সালে আইএমএফে ক্যারিয়ার শুরু করার মাধ্যমে তিনি বিগত ৪৫ বছর ধরে অর্থনীতি খাতে কাজ করছেন এবং বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো দেশের মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ খেলাপি হলেই আইএমএফ বা বিশ্ব অর্থনীতি ঘাবড়ে যায় এবং কড়া পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার অবিশ্বাস্যভাবে ৬১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। রেজা কিবরিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাতের এই চরম অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে যদি এখনই অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির আশা করাটা এক বিরাট ভুল ও বোকামি হবে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, দেশের ব্যাংকিং দক্ষতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমান ঋণ ব্যবস্থাটি একটি সম্পূর্ণ ‘ডিফল্ট সিস্টেমে’ পরিণত হয়েছে। বর্তমান কর্তৃপক্ষ ব্যাংকের ডিফল্ট বা খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে। আগে যেখানে টানা ৯০ দিন বা তিন মাস ঋণের সুদ না দিলে গ্রাহককে ডিফল্ট বা ঋণখেলাপি বলা হতো, এখন সেটাকে বাড়িয়ে ১ বছর করা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছর টাকা না দিলেও তাকে খেলাপি দেখানো হচ্ছে না, যা মূলত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতিকে আড়াল করার চেষ্টা। এর ফলে দেশের সৎ ব্যবসায়ীরা কোনো ঋণ পাচ্ছেন না এবং ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের মুখে পড়ছে।

আলোচনার জন্য প্রথমে রেজা কিবরিয়াকে সাত মিনিট সময় দেওয়া হলেও তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের গভীরতা বিবেচনা করে ডেপুটি স্পিকার তাকে আরও চার মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন। অতিরিক্ত সময় পেয়ে রেজা কিবরিয়া কিছুটা রসিকতা করে বলেন, চার মিনিটই দেওয়া হোক, কারণ পরে এই বক্তব্য তাকে ইউটিউবেও প্রকাশ করতে হবে। বক্তব্য শেষে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অতিরিক্ত আয় পেলে তার বেশিরভাগ বা পুরো অংশই স্থানীয় বাজারে ব্যয় করে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গতি আনে এবং ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু ধনী ব্যক্তিরা অতিরিক্ত অর্থ পেলে তা অলস ফেলে রাখে বা ব্যয় নাও করতে পারে, যার ফলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়।

আর্থিক খাতের এই অরাজকতার পালে হাওয়া দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এক বিস্ফোরক তথ্য দেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মাত্র চার মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে দেশের ঋণের বোঝা আরও ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার গঠনের সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা, যা মাত্র চার মাসে ২৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ এই কয়েক মাসেই দেশকে আরও ঋণের জালে বেঁধে ফেলা হয়েছে। অর্থনৈতিক সংস্কারের চরম অভাব, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার এবং नीतिগত দুর্বলতার কারণে দেশের অর্থনীতি ক্রমেই গভীর ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

আখতার হোসেন অর্থমন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেন, আমরা যদি দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারি, প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে না পারি এবং আর্থিক সংস্কার বাস্তবায়ন না করতে পারি, তবে আইএমএফের কাছ থেকে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে যেমন খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছিল, ঠিক তেমনি সংস্কার করতে না পারলে সরকারি দলকেও একদিন জনগণের কাছ থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের এই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই দেশের মানুষের রায়, গণভোটের রায় এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সঠিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আখতার হোসেন আরও বলেন, ব্যাংক খাতে বর্তমানে একধরনের প্রকাশ্য অরাজকতা ও লুটপাট চলছে। তিনি কেবল ইসলামী ব্যাংকের সংকটের কথা না তুলে সাম্প্রতিক সময়ে একীভূত করা আরও পাঁচটি ব্যাংকের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি নতুন ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন’-এর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এই আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, ব্যাংকের পূর্বের মালিকেরা যদি লুটপাট করা বা পাচার করা টাকার মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ফেরত দিতে পারেন, তবে তাদের কাছে আবারও সেই ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

তিনি প্রশ্ন তুলে জানান, যেসব মালিক এই ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে, টাকা পাচার করেছে এবং লুটপাট চালিয়েছে, সেই পুরোনো অপরাধী মালিকদের কাছেই ব্যাংকগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার পেছনে সরকারের ফায়দা বা রহস্যটা কী? দেশের বর্তমান অর্থনীতিকে একটি ভঙ্গুর ‘ঝুপড়ি’র সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময়কালের প্রকাশিত শ্বেতপত্র অনুযায়ী প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য, তা দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। ফলে দেশের অর্থনীতি এখন একটা ফাঁকা ঝুপড়ির মতো, যেখানে আসলে কোনো টাকাপয়সা অবশিষ্ট নেই। লাগামহীন খেলাপি ঋণ আমাদের অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু অবস্থায় নিয়ে গেছে এবং দেশের মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

এই political ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে আগামী ৫০ বছরেও আওয়ামী লীগের বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন ময়মনসিংহের অপর এক আসনের (ময়মনসিংহ-৭) বিএনপির সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের পরপর তিনটি জেনারেশন বা প্রজন্মকে শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে আঘাত ও ইনজুরড করেছে। প্রথমত স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, দ্বিতীয়ত কলেজের শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘হাসিনা খেদাও’ বা একদফা আন্দোলনকে তারা নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে চেয়েছিল। এই তিনটি সচেতন প্রজন্ম আগামী ৫০ বছর জীবিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের পক্ষে পুনরায় দেশের ক্ষমতায় বা রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

স্বাস্থ্য খাতে বেহাল চিত্র

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম (মাসুদ) দেশের স্বাস্থ্য খাতের করুণ চিত্র তুলে ধরে প্রশ্ন তোলেন যে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রকোপে প্রায় ৩০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, এই ব্যর্থতার দায়ে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কোনো চিন্তা করেছেন কি না। তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলে কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ওই হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখের; কিন্তু তার জন্য পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়ায় সেখানে অধ্যয়নরত প্রায় ২৪৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই বিদেশি শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের ক্যারিয়ার বাঁচাতে সচিব, মহাপরিচালক বা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে দেখা করার ন্যূনতম সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন প্রস্তাবিত বাজেটকে সাধারণ মানুষের জন্য একটি ‘হয়রানির বাজেট’ এবং ‘গরিব মারার বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন ঝাঁঝালো প্রশ্নের উত্তরে দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অত্যন্ত নাজুক ও রুগ্‌ণ চিত্রটি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে স্বীকার করে নেন। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের ৩১০টি সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৪৮৫টি এক্স-রে মেশিন এবং ২৫২টি হাসপাতালে প্রায় ৩৯৫টি আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

মন্ত্রী আরও জানান, এই অকেজো এক্স-রে মেশিনের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনের ৩৫ শতাংশ একেবারেই মেরামত অযোগ্য বা স্ক্র্যাপ হয়ে গেছে। তবে বাকি মেরামতযোগ্য মেশিনগুলো দ্রুত সচল করার জন্য ইতোমধ্যে টেন্ডার বা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, দেশের হাসপাতালগুলোতে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ডায়ালাইসিস ও আইসিইউর মতো অত্যন্ত জরুরি ও ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে রহস্যজনকভাবে বন্ধ ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া পুনরায় সচল করেছে এবং বর্তমানে ৪টি নতুন এমআরআই মেশিন ক্রয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চিকিৎসকের অভাব সংক্রান্ত গাজীপুরের সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদের সংখ্যা ৪১ হাজার ৮০৬টি হলেও এর মধ্যে বর্তমানে ৯ হাজার ৪০৭টি চিকিৎসকের পদই সম্পূর্ণ শূন্য রয়েছে, যার কারণে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার মানুষ সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিনের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে কঠিন করে তুলছে। মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত ব্যবহার, পশু ও মৎস্য খাতে এর যথেচ্ছ প্রয়োগ এবং হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এই মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) প্রকাশিত গ্লোবোক্যান ২০২২-এর প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ১ লাখ ego হাজার ২৫৬ জন নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হন এবং বছরে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন এই মরণব্যাধীতে মারা যান। বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৩ লাখ ১৬ হাজার ৪১৭ জন ক্যান্সার রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার এবং পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ও মুখ-ঠোঁটের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশের আটটি বিভাগীয় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা ইউনিট স্থাপনের প্রকল্প বর্তমানে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. কামরুল হাসানের প্রশ্নের জবাবে আরও জানান, বর্তমানে দেশে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ১৪ হাজার ৪৬০টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে এবং যেসব ওয়ার্ডে এখনো ক্লিনিক নেই, সেখানে জমি প্রাপ্তি এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে আরও ৫৪০টি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তবে নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবিরের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক তথ্য দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে প্রতি লাখে আনুমানিক ৪ হাজার ৩৫৩ জন মা সন্তান প্রসবকালীন নানা জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন এবং সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোনো মা মারা গেলে রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে তাদের পরিবারকে কোনো প্রকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা দেওয়া হয় না।

এছাড়া ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যার চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি রোগী প্রতিদিন ভর্তি হয়ে মেঝেতে ও বারান্দায় চিকিৎসা নেন বলে আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান। তবে সংরক্ষিত নারী আসনের আরিফা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অতিদ্রুত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতা

দেশের ধর্মীয় খাতের একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন (কায়কোবাদ) জানান, দেশে বর্তমানে কতজন ইমাম ও মুয়াজ্জিন কর্মরত আছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা সঠিক ডাটাবেজ এই মুহূর্তে সরকারের কাছে নেই। তবে ২০২০ সালের একটি পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রী জানান, দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মসজিদের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ১২৫টি। সেই সাধারণ হিসেবে দেশে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের সম্মিলিত সংখ্যা আনুমানিক 6 লাখ ৬২ হাজার ২৫০ জন হতে পারে।

সংসদ সদস্য মাজেদুর রহমানের অপর এক প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদানের একটি বিশেষ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই কল্যাণমুখী কার্যক্রমের আওতায় এ পর্যন্ত সারা দেশের ১২ হাজার ৮১০ জন ধর্মীয় সেবককে মাসিক ভাতার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াটি এখনো চলমান রয়েছে।

আলাদা ‘হাওড় মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি

সর্বশেষ বক্তা হিসেবে সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, সংস্কৃতি রক্ষা এবং অবহেলিত হাওড় অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে একটি আলাদা ‘হাওড় মন্ত্রণালয়’ গঠনের জোরালো দাবি জানান। দীর্ঘ সময় পর সংসদে নিজের স্মৃতিচারণ করে ৭৭ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ বলেন, ৪০ বছর আগেও তিনি এই সংসদের সদস্য ছিলেন। সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর বাজেট বক্তৃতার সুযোগ পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং ক্লান্ত শরীর নিয়েও কেবল হাউজের সম্মানে বক্তব্য রাখছেন বলে উল্লেখ করেন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল ও নিখুঁত বাজেট পেশ করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানান। তবে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বৈষম্য, মুক্তিযোদ্ধাদের অবমূল্যায়ন এবং হাওড় অঞ্চলের প্রতি অবহেলার মতো কিছু মৌলিক ত্রুটি সংশোধনের আহ্বান জানান তিনি।

বক্তৃতায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ফজলুর রহমান বলেন, সংস্কৃতির সঠিক বিকাশ না হলে দেশে কখনো সুস্থ সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না। বর্তমানের কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা বাউল গান, যাত্রা, নাটক, ফুটবল খেলা ও দুর্গাপূজার মতো আনন্দ-আয়োজন পছন্দ করে না এবং বিনোদনকে কাফেরদের কাজ বলে আমাদের মধ্যযুগে ও বর্বরতার দিকে ফিরিয়ে নিতে চায়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এক পর্যায়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের ভাতার তুলনা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাদের ভাতা দেওয়াকে সঠিক সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের ভাতার তুলনা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মহান মুক্তিযুদ্ধ এই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সঙ্গে অন্য কোনো ভাতার তুলনা করা হলে ভবিষ্যতে এর জন্য চরম খেসারত দিতে হবে। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, অন্তত এক টাকা হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাড়াতে হবে।

এরপর তিনি নিজের জন্মভূমি এবং অবহেলিত হাওড় অঞ্চলের চরম দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। চাঁদপুর থেকে শুরু করে গারো পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল হাওড় অঞ্চলের ৩০টি উপজেলার মানুষকে বাঁচাতে তিনি অবিলম্বে একটি আলাদা ‘হাওড় মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানান এবং দলীয় প্রধান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া মরিচখালি থেকে মিঠামইন পর্যন্ত ৫২০০ কোটি টাকার ফ্লাইওভার প্রকল্পটি পুনরায় চালু করার অনুরোধ জানান, যাতে ১২ মাসই হাওড়ের মানুষ ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে।

সবশেষে, দেশের চলমান সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, পলাশবাড়ীতে রাম মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে উগ্র স্লোগান দেওয়া এবং রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ফায়দা লুটতে কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে মাজার ও বাউলদের ওপর হামলা চালানো দেশের সুফিবাদের পরিপন্থি। এ দেশে দেড় কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষেরও সমান অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

এসআর/বিআরইউ