বিজ্ঞাপন

সংসদ অধিবেশনে ফজলুর রহমান

হাওর মন্ত্রণালয় গঠন ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর দাবি

হাওর মন্ত্রণালয় গঠন ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর দাবি

জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হাওর অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে একটি আলাদা ‘হাওর মন্ত্রণালয়’ গঠন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন প্রবীণ সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। 

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সংসদে স্মৃতিচারণ করে ৭৭ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ বলেন, ৪০ বছর আগেও তিনি এই সংসদের সদস্য ছিলেন। 

তিনি বলেন, মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত হলেও কেবল সংসদের সম্মানে তিনি কথা বলছেন। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে একটি বিশাল ও নিখুঁত বাজেট পেশ করার জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তবে বাজেট অত্যন্ত চমৎকার হলেও বাজেটে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বৈষম্য, মুক্তিযোদ্ধাদের অবমূল্যায়ন এবং হাওর অঞ্চলের প্রতি অবহেলার মতো কিছু মৌলিক ত্রুটি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পেশ করা মাত্র সাড়ে চারশো কোটি টাকার বাজেট তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আজ ৫৪ বছর পর সেই বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। 

এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি, সামাজিক নিরাপত্তায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি এবং স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে ঘাটতি বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের আশঙ্কার জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়েও অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে আমরা পারব না, কিন্তু আমরা পেরেছি, তাই বাজেট বাস্তবায়নও আমরা করে দেখাব।

বাজেটের খতিয়ান তুলে ধরার পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিশেষ জোর দেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ভাত ও তরকারির মতো শিক্ষা এবং সংস্কৃতির সম্পর্কও অবিচ্ছেদ্য। সংস্কৃতির সঠিক বিকাশ না হলে দেশে কখনো সুস্থ সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না।

জামায়াতে ইসলামীর এক সংসদ সদস্যের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, সংস্কৃতির নামে অনেকেই শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তারা বাউল গান, যাত্রা গান, নাটক, ফুটবল খেলা ও দুর্গাপূজার সময় গ্রামীণ আনন্দ-আয়োজন পছন্দ করেন না। বর্তমানের কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা ফুটবল খেলা দেখা বা বিনোদনকে কাফেরদের কাজ বলে আমাদের মধ্যযুগে ও বর্বরতার দিকে ফিরিয়ে নিতে চান, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এক পর্যায়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের ভাতার তুলনা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান প্রবীণ এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি তার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে এবং তাদের জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্ত। তবে বাজেটের ৪৭ ও ৪৮ নম্বর পৃষ্ঠায় যেভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের ভাতার তুলনা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ফজলুর রহমান বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সঙ্গে অন্য কোনো ভাতার তুলনা করা হলে ভবিষ্যতে এর জন্য চরম খেসারত দিতে হবে। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, অন্তত এক টাকা হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাড়াতে হবে, অন্যথায় আগামী পাঁচ বছর পর জনগণের কাছে কোনো জবাব দেওয়া যাবে না।

এরপর তিনি নিজের জন্মভূমি এবং হাওর অঞ্চলের চরম দুরবস্থার কথা তুলে ধরে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। চাঁদপুর থেকে শুরু করে গারো পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল হাওর অঞ্চলকে অতীতে ‘কালিদর সাগর’ বলা হতো উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাজেট বইয়ের ৬৬ পৃষ্ঠায় এই অঞ্চলের মানুষের জন্য মাত্র একটি লাইন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একসময় যে হাওর অঞ্চলে দুধের গাভী, হালের বলদ ও প্রচুর মাছ ছিল, আজ বারবার আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সেখানকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, আগে যেখানে রংপুর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক কাজ করতে যেত, এখন ফসলের ক্ষতির কারণে হাওর অঞ্চলের মানুষ সারা দেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যায়। এই অবহেলিত ভাটি অঞ্চলের ৩০টি উপজেলার মানুষকে বাঁচাতে এবং অফুরন্ত খনিজ সম্পদ ও মৎস্য সম্পদকে কাজে লাগাতে তিনি অবিলম্বে একটি আলাদা ‘হাওর মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানান এবং দলীয় প্রধান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একই সাথে ইউনুস সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া মরিচখালি থেকে মিঠামইন পর্যন্ত ৫২০০ কোটি টাকার ফ্লাইওভার প্রকল্পটি পুনরায় চালু করার অনুরোধ জানান, যাতে ১২ মাসই হাওড়ের মানুষ ঢাকার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে এবং এটি দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

দেশের চলমান সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, পলাশবাড়ীতে রাম মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে যেভাবে ‘মালাউনরা দেশ ছাড়ো’ স্লোগান দিয়ে মিছিল করা হচ্ছে, তা দেশের আবহমান সুফিবাদের পরিপন্থি। এ দেশে দেড় কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষেরও সমান অধিকার রয়েছে। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ফায়দা লুটতে একদল মানুষ মাজার ভেঙে ফেলছে এবং কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে পীর ও বাউলদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তিনি সরকারকে এই ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

এসআর/আরএফ/এসএইচএ