চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে জাতীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি।
রোববার (২৮ জুন) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার বিষয়টি শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বক্তারা অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে, বিশেষ করে দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তারা বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় এনসিটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। এ লক্ষ্যে গঠিত নেগোসিয়েশন কমিটিকে সহায়তা দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাপোর্ট টিম গঠন করেছে।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। তারা এ উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান।
তারা বলেন, চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল। একইভাবে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালও দেশের জনগণের অর্থে নির্মিত জাতীয় সম্পদ। এসব স্থাপনায় নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নেই। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। টার্মিনালটি নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করছে।
তাদের দাবি, এনসিটির বার্ষিক অবকাঠামোগত সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডল করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এনসিটি এক মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডল করে নতুন রেকর্ড করেছে। দেশীয় ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ নয়; বরং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের আগেই ২০২৫ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বেড়েছে এবং এর প্রভাব শিল্প, ব্যবসা, কৃষি ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ছে বলে দাবি করেন তারা।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় এবং দেশের উন্নয়ন কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল ইজারা দেওয়া হলে আয়ের বড় অংশ লভ্যাংশ ও মুনাফা হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে তারা বলেন, বন্দর এলাকার আশপাশে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনা কেপিআই-১ হিসেবে স্বীকৃত। তাই বন্দরের কৌশলগত স্থাপনায় বিদেশি নিয়ন্ত্রণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তারা প্রশ্ন তোলেন, দেশের এমন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা আদৌ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও টার্মিনাল ও লালদিয়া চর সংক্রান্ত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। এসব চুক্তি প্রকাশ না করায় সন্দেহ তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তারা। ২০২৩ সালে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে সেখানে দৃশ্যমান বড় কোনো বিনিয়োগ দেখা যায়নি বলে তারা দাবি করেন।
তারা আরও বলেন, অতীতে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ শ্রমিক ও জনগণের প্রতিরোধের মুখে বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানেও একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে— এনসিটি ও সিসিটি কোনো দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ করা, চট্টগ্রাম বন্দরের সব টার্মিনাল বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করা, বন্দর-সংশ্লিষ্ট সব চুক্তি জনগণের সামনে প্রকাশ করা, জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি না করা এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে জাতীয় মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার আওতায় রাখার ঘোষণা দেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১ জুলাই সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্বরে এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিলের দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন করবে বন্দর রক্ষা কমিটি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম এবং বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু।
এমআর/এমএসএ
