বিজ্ঞাপন

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতা ও আচরণগত পরিবর্তনের বিকল্প নেই

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতা ও আচরণগত পরিবর্তনের বিকল্প নেই

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাত এখন অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও শুধু উন্নত প্রযুক্তি বা পূর্বাভাসব্যবস্থা দিয়ে এই ক্ষতি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। বজ্রপাতের মতো আকস্মিক দুর্যোগ থেকে জীবন রক্ষায় মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার সতর্কবার্তা অনুযায়ী আচরণগত পরিবর্তন সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

রোববার (২৮ জুন) আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর খামারবাড়ির কেআইবি কমপ্লেক্সের থ্রিডি হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। 

আঞ্চলিক সমন্বিত মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস), বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি), ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন ও ব্র্যাক যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’। 

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বহুমাত্রিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হলেও বর্তমান বাস্তবতায় ভূমিকম্প ও বজ্রপাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি কমাতে সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সুরক্ষা অবকাঠামো ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

বক্তারা বলেন, উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তির পাশাপাশি সঠিক সময়ে মানুষের কাছে নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং সেই অনুযায়ী আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানের অধিবেশনে সহযোগী সংস্থাগুলোর চলমান ও ভবিষ্যৎ উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। সেখানে সেভ দ্য চিলড্রেনের ম্যানেজার জাভেদ মিয়াঁদাদ জিএফএফও-সমর্থিত প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রাইমসের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ফকরুল আরেফিন রাইমস–ইউনিসেফ সহযোগিতার বিভিন্ন কার্যক্রম উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া এফসিডিওর ক্লাইমেট অ্যান্ড লাইভলিহুডস অ্যাডভাইজার এবং ডেপুটি টিম লিডার এ বি এম ফিরোজ আহমেদ ইউকে-বডিহাইড্রমেট কোলাবোরেশনের উদ্যোগ তুলে ধরেন।

‘মাঠ থেকে কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সুনামগঞ্জের মো. এমদাদ হোসেন, আরেফিন, ফোরকান উদ্দিন, সন্ধ্যা রানী দাস ও সাগরিকা। তারা কেউ বজ্রপাতে স্বজন হারিয়েছেন, আবার কেউ সরাসরি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রাশাদুজ্জামানের সঞ্চালনায় তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বজ্রপাত মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আলোচনায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে বিদ্যালয়ের ছুটি সমন্বয়, নৌযানে লাইফ জ্যাকেট রাখা, বজ্রপাতের সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া এবং কৃষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

কারিগরি অধিবেশনে আবহাওয়াবিদ এস. এম. কামরুল হাসান জানান, রাইমসের কারিগরি সহায়তায় ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘বজ্রপাত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা’ চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে ১ থেকে ৬ ঘণ্টা আগেই বিএমডির ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আগেই পূর্বাভাস ছিল, কিন্তু সেই তথ্য মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি বা ব্যবহার হয়নি। এই প্রযুক্তিকে স্থায়ী ও তৃণমূলমুখী করতে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সচেতনতাই জীবন রক্ষার প্রধান উপায়।

রাইমসের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মো. গোলাম রব্বানি বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন, মেঘের বৈদ্যুতিক চার্জ ও ভূমির ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহের সংযোগে বজ্রপাত ঘটে, যা বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণেও ভূমিকা রাখে।

তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে এবং এতে প্রায় ৩৫০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং এপ্রিল–মে মাসে ঝুঁকি বেশি থাকে।

একইসাথে খোলা মাঠে দলবদ্ধ হয়ে অবস্থান না করা, বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

এসময় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের খামার বিভাগের উপপরিচালক মো. শরীফুল হক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. জামাল উদ্দিন  উপস্থিত ছিলেন।

আরএইচটি/এমএসএ  

বিজ্ঞাপন