বিজ্ঞাপন

সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী

১৪ দিনেই মিলবে এলসি সুবিধা, ডিজিটাল হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স

১৪ দিনেই মিলবে এলসি সুবিধা, ডিজিটাল হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স

দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ঢেলে সাজাতে এবং ব্যবসায়ের দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে নতুন কোনো কোম্পানির যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার পর্যায়ে যেতে আর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে না, প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই প্রক্রিয়া মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনার কাজ চলছে। একইসঙ্গে ব্যবসার প্রথম ধাপ ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তিকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা হচ্ছে, যার ফলে দেশের যেকোনো অঞ্চলের উদ্যোক্তারা ঘরে বসেই মাত্র একটি পোর্টাল থেকে লাইসেন্স ডাউনলোড করতে পারবেন। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের এই ঐতিহাসিক সংস্কার ও ইজ অব ডুইং বিজনেস মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী রোডম্যাপ তুলে ধরেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত বাজেটকে প্রত্যাশাতীত ও যুগান্তকারী আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এই বাজেট দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বিগত এক যুগেরও বেশি সময়ের বাজেট বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো মেগা প্রকল্পের নামে অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির উৎসব বন্ধ করে ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৩.১ শতাংশে এবং স্বাস্থ্য খাতে ৬.৭১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা কমিয়ে অপচয় রোধে খরচের লাগাম শক্তভাবে টেনে ধরা হয়েছে।

দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও বাজার ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও বা আইসিওআর কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বর্তমানের ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে আমাদের আগামী আট বছরে শতভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগের কার্যকারিতা বাড়িয়ে আইসিওআর চার শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে, যা প্রতি এক শতাংশ বিনিয়োগের বিপরীতে আড়াই শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি এনে দেবে। একইসঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বর্তমানের সাড়ে ২১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৩২-৩৩ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে রিয়াল জিডিপি গ্রোথ আট শতাংশে উন্নীত করার মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জন সম্ভব।

মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর জন্য লজিস্টিক কস্ট বা পণ্য পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা খরচ বর্তমানের ১৬ শতাংশ থেকে বৈশ্বিক মানদণ্ড ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার কাজ চলছে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এরইমধ্যে ডেনিশ কোম্পানির অন্তর্ভুক্তিসহ একাধিক টার্মিনাল আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বগুড়া বা ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকের ২০ টাকার পণ্য ঢাকার কারওয়ান বাজারে এসে কেন ৭২ টাকা হচ্ছে, সেই মধ্যস্বত্বভোগী ও অদৃশ্য খরচের উৎসগুলো চিহ্নিত করে একটি আধুনিক তথ্য শেয়ারিং মেকানিজম তৈরি করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার জেনারেশন এবং ই-ভেহিকেল বা হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ২০২৯ সাল পর্যন্ত তিন বছর পেছানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জ্বালানি সংকট সমাধানে নতুন এফএসআরও সংযোজনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কাজ চলছে। এমনকি সার কারখানাগুলোর জন্য ডেডিকেটেড এলএনজি নেটওয়ার্ক তৈরির একটি ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন হয়েছে।

দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ইজ অব ডুইং বিজনেসের দীর্ঘসূত্রিতা দূর করার ঘোষণা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতে একটি কোম্পানি চালু করতে যেখানে গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লাগত, এখন প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেটি কমিয়ে নতুন কোম্পানির যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার পর্যায়ে যেতে মাত্র ১৪ দিন সময় লাগবে। ফায়ার লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সংস্থার ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন এখন একটি সমন্বিত এজেন্সির মাধ্যমে দ্রুত সম্পন্ন হবে। এছাড়া ব্যবসার প্রথম ধাপ ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি সম্পূর্ণ সহজ করতে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টাল চালু করা হচ্ছে। দেশের যেকোনো ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের ব্যবসায়ীকে আর কোনো সরকারি অফিসে যেতে হবে না; তারা ঘরে বসেই অনলাইনে ফি ও তথ্য জমা দিয়ে সরাসরি ট্রেড লাইসেন্স ডাউনলোড করতে পারবেন এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই রাজস্ব নির্দিষ্ট স্থানীয় সরকারের তহবিলে জমা হয়ে যাবে। আরজেএসসি এবং শেয়ার ট্রান্সফার প্রক্রিয়াও পুরোপুরি ডিজিটাল করা হচ্ছে।

দেশের ঝিমিয়ে পড়া সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে চামড়া ও পাট শিল্পে ব্যাপক সংস্কারের কথা জানান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের চামড়া রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে এক বিলিয়ন ডলারের ঘরে আটকে আছে, অথচ প্রতি বছর প্রায় এক কোটি পশু কোরবানি হয়। সাভারের ট্যানারি সিইটিপির ত্রুটিগুলো সংশোধন করে এবং প্রতিটি ট্যানারিকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে এলডব্লিউজি গোল্ড সনদ নিতে বাধ্য করা হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চামড়া সর্বোচ্চ মূল্য পায়। সঠিকভাবে এই খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে একে ১০-১২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। পাটের বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে চীনা সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি উন্নত রিসার্চ ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু প্যাকেজিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কটন বা অন্য ফাইবারের সঙ্গে ব্লেন্ডেড ফেব্রিক তৈরি করে পাট খাতকে একটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের রিটার্নমুখী শিল্পে পরিণত করা হবে। অর্থমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সঠিক পথে রয়েছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

এসআর/জেডএস

বিজ্ঞাপন