২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করতে সোলার পাওয়ারের সব ধরনের যন্ত্রাংশ ও ক্যাপাসিটি ব্যাংকের ওপর থেকে সম্পূর্ণ শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সাথে এই খাত থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ২০৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিদ্যুৎ খাতে বিপুলভাবে উৎসাহিত করবে।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
মন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকার তুলনায় এই বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থাৎ ১৭ হাজার ১৯২ কোটি ৮২ লক্ষ টাকাই রাখা হয়েছে উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে। পরিচালন ব্যয় মাত্র ১৫২ কোটি ২২ লক্ষ টাকা হওয়ায় এটি স্পষ্ট যে সরকার বিদ্যুৎ খাতের পরিচালন বা দৈনিক খরচের চেয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ ৯৯ শতাংশ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন কাজের জন্য ১৪ হাজার ৯৩৮ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা এবং জ্বালানি বিভাগের জন্য ২ হাজার ২৫৪ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া একটি বিধ্বস্ত বিদ্যুৎ খাত পেয়েছিল। বিগত ১৫ বছরে এই খাতকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল বকেয়া রেখে যাওয়া হয়েছে। এর বাইরেও বিগত সরকার এমন সব বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি করে গেছে যেখানে সোভরেইন গ্যারান্টি বা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা দেওয়া ছিল। এই একপেশে চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে গেলে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি ভাঙার বা ক্যাশ করার হুমকি দেওয়া হয়। এমন একটি বৈরী ও জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার বেসরকারি খাতের সাথে আলোচনা করে একটি পারস্পরিক লাভজনক বা 'উইন-উইন' পরিস্থিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, এমন সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এবার কেবল সরাসরি আর্থিক বরাদ্দই দেওয়া হয়নি, বরং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুরোধে সোলার পাওয়ার বা সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রাংশ এবং ক্যাপাসিটি ব্যাংকের ওপর থেকে যাবতীয় শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। একই সাথে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই খাতকে শতভাগ করমুক্ত বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই ফিসকাল ও মনিটারি সুবিধাগুলো যদি মূল বাজেটের সাথে যোগ করা হয়, তবে দেখা যাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিদ্যুৎ খাতে এবারই সবচেয়ে বড় সুবিধা ও বাজেট দেওয়া হয়েছে। এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সোলার এবং উইন্ড পাওয়ারে বিনিয়োগে দারুণভাবে উৎসাহিত হবেন, যার ফলে বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সৌর বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক সুফল তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। সরকার ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন আমদানিতে শুল্কছাড় ও ট্যাক্স কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে দেশে ইলেকট্রিক যানবাহন চলাচল শুরু হলে জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেল-গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক কমে যাবে, যা দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভ সাশ্রয় করবে। তবে সৌর বিদ্যুৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা দিনে পাওয়া যায় এবং বর্ষাকালে সূর্যের আলো কম থাকার কারণে উৎপাদন কিছুটা বিঘ্নিত হতে পারে। সেই জরুরি বা আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ব্যাকআপ বা স্ট্যান্ডবাই হিসেবে দেশের তেল ও গ্যাসভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পাওয়ার স্টেশনগুলোকেও সমান্তরালভাবে সচল ও আধুনিক রাখা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের নিজস্ব জ্বালানি অনুসন্ধান প্রসঙ্গে মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত ১৭ বছরে পূর্ববর্তী সরকার দেশের স্থলভাগ কিংবা বঙ্গোপসাগরে কোনো নতুন কূপ খনন করেনি এবং নতুন গ্যাস উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার কারণেই আজ দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট দূর করতে বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র বা ইন্টারন্যাশনাল বিডিং ঘোষণা করেছে, যা আগামী ১১ নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী করে স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলন শুরু হবে। সাময়িকভাবে শিল্প-কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে এলএনজি বা গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ বিতরণে জাতীয় গ্রিডের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, অতীতে প্রচুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলেও সঞ্চালন গ্রিডগুলোকে আপগ্রেড বা আধুনিকায়ন করা হয়নি। এমনকি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের উপযোগী গ্রিডও তৈরি ছিল না। বর্তমান সরকার এই গ্রিডগুলোকে আধুনিক করে ডিজিটাল বা স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তর করার জন্য একাধিক বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে। পাশাপাশি পাকিস্তান আমলে তৈরি দেশের একমাত্র পুরোনো তেল শোধনাগারটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় 'সেকেন্ড রিফাইনারি' বা দ্বিতীয় তেল শোধনাগার নির্মাণের কারিগরি টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ করে এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেলে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
মন্ত্রী আঞ্চলিক সহযোগিতা ও শিল্পায়নের ওপর জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান এই চার দেশ মিলে একটি আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জলবিদ্যুতে উৎপাদন খরচ না থাকায় নেপাল বা ভুটান থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ আমদানি করে দেশের কলকারখানায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এছাড়া শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে ক্যাপটিভ পাওয়ারের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে উৎপাদন খরচ কমে আসে এবং দেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত অর্থের প্রতিটি টাকা যেন সুচারুভাবে এবং স্বচ্ছতার সাথে বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয়, সেজন্য মন্ত্রণালয় থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ বা ক্লোজ মনিটরিং করা হবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এসআর/এমএসএ
