দেশের মানুষ অতীতে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, তাই বর্তমান সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার যে বাজেট পেশ করেছে, তা দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতা ও সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
দীর্ঘ অসুস্থতা কাটিয়ে সংসদে ফিরে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের লুটেরা অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী এবং গ্রহণযোগ্য বাজেট পেশ করেছেন।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আবেগপ্লুত কণ্ঠে সংসদকে জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বরে স্ট্রোক করার পর দেশবাসী ও সহকর্মীদের দোয়ায় আল্লাহ তাআলা তাকে যেন নতুন জীবন দান করেছেন। বেঁচে থাকা অবস্থায় এ দেশে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন দেখতে পেরে এবং একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পঞ্চমবারের মতো এই মর্যাদাপূর্ণ সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছেন তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
সংসদে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বিএনপির এই বর্ষীয়ান নেতা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষক থাকা অবস্থায় স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাকে রাজনীতিতে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান তাকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে সংগঠিত করার যে গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন, তা তিনি সফলভাবে পালন করেছিলেন। জিয়ার শাহাদাত বরণের পর যখন অনেকে বলেছিল বিএনপি শূন্য হয়ে যাবে, তখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে দলের পতাকা তুলে ধরেন এবং তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দেন। বেগম খালেদা জিয়ার অধীনে তিনবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি দলের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বর্তমানে দেশের সংকটময় মুহূর্তে বিদেশের মাটিতে থেকেও দলের হাল ধরা এবং দেশে গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান। ডক্টর মোশাররফ বর্তমান সরকারের মাত্র চার মাসের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে বৈপ্লবিক ও অত্যন্ত সফল উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা ও শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সফরের সফলতার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চীনের ১১টি বড় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ৯.২১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এবং দেশের অনেক অসম্পূর্ণ কাজ বাস্তবায়নে চীন সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
চলতি বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি বাজেট তখনই পূর্ণাঙ্গ ও অর্থবহ হয় যখন সেটির ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা দুটোই হয়। বিরোধী দল সংসদে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে এই বাজেটের যে সমালোচনা ও মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছে, তাকে তিনি স্বাগত জানান। বিগত সরকারের সময়ে দেশের অর্থব্যবস্থাকে যেভাবে লুটপাট করে একটি কঠিন অবস্থায় দাঁড় করানো হয়েছিল এবং বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতায় দিশেহারা অবস্থা থেকে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণায় অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ স্বাধীন করার উদাহরণ টেনে বলেন, বাঙালি জাতি চাইলে সব পারে। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনবার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনও এ দেশের মানুষই করে দেখিয়েছে। বর্তমান সুপ্রিম কোর্টও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই সংসদ ও দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা কোনো কঠিন কাজ নয়।
ডক্টর মোশাররফ তার নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লার জনগণের দীর্ঘদিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সংসদের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা কুমিল্লাকে ‘কুমিল্লা’ নামেই বিভাগ ঘোষণা করার সরকারি আশ্বাসকে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পাশাপাশি কুমিল্লার পুরানো ও ঐতিহ্যবাহী বিমানবন্দরটি দ্রুত মেরামত করে পুনরায় পুরোদমে চালু করা এবং ঢাকা ও কুমিল্লার মধ্যে নতুন রেলওয়ে কর্ডলাইন নির্মাণের প্রকল্প দ্রুত শেষ করার জোর দাবি জানান।
তিনি বলেন, এই রেললাইনটি সম্পন্ন হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের যাতায়াতের সময় ও খরচ অভূতপূর্বভাবে কমে যাবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও তিনি দাউদকান্দিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানান।
এসআর/এমএসএ
