বিজ্ঞাপন

ধানমন্ডির আবাসিক পরিবেশ রক্ষায় নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ

ধানমন্ডির আবাসিক পরিবেশ রক্ষায় নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ

রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া প্লট ও ভবনগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নীতিমালার পরিপন্থি কোনো ব্যবহার বা অনিয়ম পাওয়া গেলে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ধানমন্ডির আবাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে, পর্যাপ্ত পার্কিং ও যানজট নিরসনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন ও যুগোপযোগী বাণিজ্যিক নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গত ৮ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব সিদ্ধান্ত ও তথ্যের কথা জানা গেছে।

সভায় জানানো হয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত একটি অঞ্চল। ১৯৯৫ সালে প্রণীত বাণিজ্যিক নীতিমালার আওতায় মিরপুর রোড, সাত মসজিদ রোড, গ্রিন রোড, ধানমন্ডি-২ নম্বর (পুরাতন) সড়ক এবং ধানমন্ডি-২৭ নম্বর (পুরাতন) সড়কসংলগ্ন প্লটগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন দিয়ে আসছে মন্ত্রণালয়। তবে এই নীতিমালা প্রণয়নের দীর্ঘ ৩১ বছর পার হয়ে যাওয়ায়, আধুনিক নগরায়ণের চাহিদা ও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এটি এখন হালনাগাদ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সভায় অতিরিক্ত সচিব (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ) বলেন, ধানমন্ডির আবাসিক এলাকায় অবস্থিত অনেক বাণিজ্যিক ভবনে পর্যাপ্ত কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। সময়ের পরিবর্তন, নগরায়ণের প্রভাব এবং বাস্তব প্রয়োজনের কারণে বিদ্যমান নীতিমালার কিছু ধারা যুগোপযোগীভাবে হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাবারের হোটেল ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সামনে দিনের অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকে। পরিকল্পিত ধানমন্ডিতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ও অননুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহারকে আইনগত কাঠামোর আওতায় আনা, ট্রাফিক জট নিরসন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়ন নিশ্চিত করা, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে একটি সমন্বিত ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ।

সভায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি ও রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার জানান, অনুমোদিত বাণিজ্যিক প্লট ছাড়াও ধানমন্ডির কিছু আবাসিক ভবন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ভবন ব্যবহারকারী, গ্রাহক ও দর্শন্টার্থীদের যানবাহন সড়কের ওপর পার্কিং করতে দেখা যায়, যা এলাকার স্বাভাবিক যান চলাচল ও পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাবারের হোটেল ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সামনে দিনের অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকে। পরিকল্পিত ধানমন্ডিতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কার পার্কিং, যানবাহন প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতের নীতিমালায় পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে যানজট নিরসন এবং এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সভায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রতিনিধি বলেন, সময়ের সঙ্গে নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যানবাহনের চাপ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণের কারণে বিদ্যমান নীতিমালার কিছু ধারা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা, পরিবেশগত প্রভাব, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালাটি হালনাগাদ করা উচিত।

রাজউকের প্রতিনিধি আরও বলেন, ভবিষ্যৎ নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ (বিবিআরএ), রাজউকের মাস্টার প্ল্যান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইন, বিধি ও পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা আবশ্যক। এর মাধ্যমে একদিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হবে, অন্যদিকে আবাসিক এলাকার পরিবেশ, নাগরিক সুবিধা ও জীবনযাত্রার মানও সংরক্ষিত থাকবে।

১৯৯৫ সালের নীতিমালার আওতায় বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া প্লটের ওপর নির্মিত ভবনগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নীতিমালার পরিপন্থি কোনো ব্যবহার বা অনিয়ম পাওয়া গেলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরের কোনো এলাকার প্লটকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

নতুন নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি গঠন

বিদ্যমান বাণিজ্যিক নীতিমালাকে যুগোপযোগী নগরায়ণ প্রবণতা ও বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে অতিরিক্ত সচিব (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ)-কে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খসড়া নীতিমালা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার অভিমতও ব্যক্ত করা হয়।

সভা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে চারটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক ব্যবহার নীতিমালার আওতায় প্লট ও ভবনগুলোর বর্তমান কার্যক্রমে নীতিমালার পরিপন্থি কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহার বা অনিয়ম পাওয়া গেলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা শহরের কোনো এলাকার প্লটের মূল মাস্টার প্ল্যান পরিবর্তন করে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজউককে অবশ্যই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

একইসঙ্গে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ (বিবিআরএ), রাজউকের মাস্টার প্ল্যান এবং প্রাসঙ্গিক আইন-বিধির আলোকে হালনাগাদ বাণিজ্যিক নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অতিরিক্ত সচিব (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ)-কে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খসড়া নীতিমালা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করবে।

নতুন ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন কার্যক্রম চলমান থাকবে বলেও সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসএইচআর/এমএসএ