বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তি নির্ভর নিয়োগে বদলে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস

প্রযুক্তি নির্ভর নিয়োগে বদলে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ার ফাইটার নিয়োগে অনিয়মের সব পথ বন্ধ করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও বহুমাত্রিক তদারকির ব্যবস্থা চালু করেছে অধিদপ্তর। সিসি ক্যামেরা, ড্রোন, ভিডিও রেকর্ডিং, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এবং প্রতিদিন ফল প্রকাশের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিই নয়, পুরো নিয়োগ কার্যক্রমে উপস্থিত রয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি প্রতিদিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম তদারকি করছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, গত ১১ জুন থেকে নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচলে অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মাল্টিপারপাস ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ফায়ার ফাইটার নিয়োগের শারীরিক যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষা শুরু হয়েছে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

বিশেওজ্ঞরা জানিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ হবে, ততই অনিয়ম, তদবির ও দালালচক্রের প্রভাব কমবে। সিসি ক্যামেরা, ড্রোন নজরদারি, ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ, একাধিক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এবং প্রতিদিন ফল প্রকাশের মতো উদ্যোগ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থা ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ উঠলে তা যাচাইয়ের সুযোগও তৈরি করে, যা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর।

ধাপে ধাপে হচ্ছে কঠোর বাছাই

সরেজমিনে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রক্রিয়ার শুরুতেই প্রবেশপত্র যাচাই করে জেলাভিত্তিক ২০ জন করে প্রার্থীকে মাঠে প্রবেশ করানো হয়। এরপর তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, উচ্চতা, ওজন এবং বুকের মাপ পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিক যাচাইয়ে উত্তীর্ণদের ১ মিনিট ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ৪০০ মিটার দৌড় সম্পন্ন করতে হয়। দৌড়ে সফল প্রার্থীদের পাঁচজন করে পুশ-আপ পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। একটানা ১৫টি পুশ-আপ সম্পন্ন করতে পারলেই তারা মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন। মেডিক্যাল পরীক্ষা পরিচালনা করছেন পাঁচ সদস্যের একটি দল। এতে ফায়ার সার্ভিসের দুজন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিনজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করা প্রার্থীদের ছবি তোলা, তথ্য নিবন্ধন, স্বাক্ষর গ্রহণ এবং কম্পিউটারে তথ্য সংরক্ষণের পর একই দিন লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্বাচিতদের তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে।

প্রতিদিনই প্রকাশ হচ্ছে ফল

জানা গেছে, প্রতিদিনের শারীরিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্বাচিতদের তালিকা ফায়ার সার্ভিসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হচ্ছে। বন্ধ হচ্ছে অযোগ্য প্রার্থীদের তদবিরের সুযোগও। ৪০০ মিটার দৌড়েরও থাকছে ভিডিও রেকর্ড সরেজমিনে দেখা গেছে, ৪০০ মিটার দৌড়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রতিযোগিতা ভিডিওতে ধারণ করা হচ্ছে। ফলে কোনো প্রার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৌড় শেষ করতে না পারলে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় পরবর্তীতে কোনো অভিযোগ উঠলেও তা যাচাই করা সম্ভব হবে। শুধু দৌড় নয়, নিয়োগের প্রতিটি ধাপ সিসি ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, ড্রোন ও স্থিরচিত্র ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছে। আর যেসব প্রার্থী কোনো ধাপে অযোগ্য বিবেচিত হচ্ছেন, তাদের আঙুলে অমোচনীয় কালি দিয়ে চিহ্নিত করে নির্ধারিত পথ দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকে।

সচ্ছতা নিশ্চিত করতে মাঠে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা

জানা গেছে এই নিয়োগ কার্যক্রম তদারকি করছেন নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন। তার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্ম কমিশনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকছেন। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল নিজেও মাঠে উপস্থিত থাকছেন। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, নিয়োগ কার্যক্রমে কাগুজে তদারকির বদলে বাস্তব উপস্থিতিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন সার্বক্ষণিক মাঠে অবস্থান করে প্রতিটি ধাপ পরিচালনা ও তদারকি করছেন। অন্যদিকে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সিসিটিভির মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ফলে মাঠের প্রতিটি কার্যক্রম তাৎক্ষণিক নজরদারির আওতায় থাকছে এবং অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকছে না।

দালালের খপ্পর এড়াতে দেওয়া হচ্ছে ব্রিফিং

শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের উদ্দেশে পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার সতর্কতামূলক ব্রিফিং দেন। 

তিনি প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, কোনো প্রতারক বা দালালের প্রলোভনে পড়ে যেন কেউ অনৈতিক আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে না পড়েন। নিয়োগ সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে। এদিকে নিয়োগস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া অন্য কাউকে প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মাঠের ভেতর ও বাইরে বিভিন্ন স্থানে দালাল ও অনৈতিক লেনদেনবিরোধী সতর্কতামূলক ব্যানার টাঙানো হয়েছে। একই ধরনের সতর্কবার্তা নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও।

জুলাইয়ে লিখিত, আগস্টে শেষ হবে নিয়োগ 

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং পরীক্ষার দিনই ফল প্রকাশ করা হবে। লিখিত পরীক্ষা পরিচালনায় কারিগরি সহায়তা দেবে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)। এরপর আগস্টের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে পুরো নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। অধিদপ্তর জানিয়েছে, ফায়ার ফাইটার নিয়োগে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা তদবিরের সুযোগ নেই। তাই দালাল বা প্রতারকের খপ্পরে না পড়ে নিয়ম মেনে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য চাকরিপ্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শতভাগ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক করতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। কোনো ধরনের তদবির, সুপারিশ বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। যোগ্য প্রার্থীরাই কেবল নির্বাচিত হচ্ছেন। নিয়োগ নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি ধরে রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন) মো. জসিম উদ্দীন বলেন, নিয়োগ কার্যক্রম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত বিধিমালা অনুসারে সম্পন্ন হচ্ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন বলেন, আমরা এমন একটি নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি, যেখানে প্রার্থীর মেধা, শারীরিক সক্ষমতা ও যোগ্যতাই একমাত্র বিবেচ্য। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার, কঠোর নজরদারি এবং বহুমাত্রিক তদারকির কারণে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মুহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, সরকারি বাহিনীতে জনবল নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শুধু বিধিমালা থাকলেই হয় না, সেটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নেরও প্রমাণ থাকতে হয়। ফায়ার সার্ভিস যে নিয়োগের প্রতিটি ধাপে সিসিটিভি, ড্রোন নজরদারি, ভিডিও রেকর্ডিং এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছে, তা অনিয়মের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রার্থীদের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ উঠলে সংরক্ষিত ভিডিও ও ডিজিটাল তথ্য যাচাইয়ের সুযোগও থাকবে। এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমাত্রিক তদারকি অন্যান্য সরকারি নিয়োগের জন্যও একটি কার্যকর মডেল হতে পারে।

এমএম/এমএসএ