বিজ্ঞাপন

সংসদে অর্থবিল পাস

করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে ৪ লাখ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা

করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে ৪ লাখ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা

জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সুদৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। 

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী ও সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার সব সময়ই কৃষি এবং কৃষিবান্ধব নীতিতে বিশ্বাসী। দলটি যখনই দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে, তখনই দেশের পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মতো বৃহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং এরই অংশ হিসেবে উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই বাজেটকে অত্যন্ত সুন্দর, স্বাভাবিক ও বাস্তবমুখী হিসেবে আখ্যায়িত করে সংসদ নেতা বলেন, এই বাজেট দেশের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে। তিনি সংসদ সদস্যদের দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার তার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে এগিয়ে চলছে, যদিও এই পথটি অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশের মানুষের পরিশ্রমী মনোভাব, তরুণ সমাজের মেধা, কৃষকদের উৎপাদনশীলতা, প্রবাসীদের গভীর দেশপ্রেম এবং দেশের উদ্যোক্তাদের অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া দেশের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি এই বাজেটকে শুধু সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে না দেখে একটি সামগ্রিক দেশ পুনর্গঠনের বাজেট হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।

dhakapost

তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, এই বাংলাদেশে আর যেন কোনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার কায়েম হতে না পারে এবং কেউ যেন এই দেশকে কোনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে। দেশের কৃষি খাতের সাম্প্রতিক সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি জানান, গত তিন মাসেই দেশে ৯০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ৫ বছরে সারা দেশে আরও ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। 

দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটকে অস্বীকার বা সংকটের অজুহাত না বানিয়ে তা সফলভাবে মোকাবিলা করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি জানান, এবারের বাজেটে ৬১টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করার ফলে বাজারে পণ্যের দাম বর্তমানে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটের ম‚ল দর্শন হলো বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের চাকাকে সচল করা এবং অর্থনীতিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের কবল থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যে দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তে¡ও উন্নয়ন ব্যয় পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করে তিন লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যেখানে সরকারি প্রকল্পের ব্যয়ের চেয়ে মানুষের জীবনে তার প্রভাব ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেই ম‚ল বিবেচনা হিসেবে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট অনুরোধ ও দীর্ঘ আলোচনার পর জাতীয় সংসদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর মাধ্যমে অর্থবিল-২০২৬ চূড়ান্তভাবে পাস হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা পৌনে ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হলেও পাসকৃত বিলে তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা তাদের আয়ের ওপর আগামী অর্থবছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার পরিবর্তে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

একই সঙ্গে জনমনে তৈরি হওয়া ব্যাপক বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ দূর করতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন এবং সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রেও টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।

বাজেটে প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনে আনা একটি বিশেষ বিধান, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ সৃষ্টির সমালোচনা চলছিল, সেটিও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অর্থবিল থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে, তবে শর্ত হিসেবে এই কর-সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাংগুয়েজ ল্যাব স্থাপন করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে অনলাইন ভিডিও ভিত্তিক সেবা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যার ফলে ব্যবসায়ীরা অনানুষ্ঠানিক উপায়ের পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত হবেন।

এছাড়া স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকারের ভ্যাট কাঠামো নতুন করে নির্ধারণের পাশাপাশি এসব অলংকার কেনার ক্ষেত্রে ৫০ পয়সা হারে উৎসে কর কাটার নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। দেশের স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ের ভ্যাট এবং বিটিআরসির সঙ্গে টেলিকম কোম্পানিগুলোর রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। চিংড়িশিল্পের প্রসার ও রপ্তানি বাড়াতে ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেওয়া হয়েছে।

dhakapost

পাশাপাশি ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত মধু আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারসহ পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড-রোলড শিট ও রোল প্রোডাক্টের অক্সাইড আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক তারের জন্য কপার আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং অপ্রক্রিয়াজাত কাজু বাদাম আমদানিতে কাস্টম শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প ও প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস উৎপাদনের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সাইকেলের ওপর শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান

সংসদীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এবং অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে সংসদে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী বক্তব্য পেশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বিরোধীদলকে দুর্বল করার রাজনৈতিক প্রবণতা থেকে সরে এসে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সংসদকে একটি দুই চাকার যানবাহনের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, এই সংসদেরও দুটি টায়ার রয়েছে, যার একটি সরকারি দল এবং অন্যটি বিরোধী দল। যেকোনো একটি টায়ার অকেজো হয়ে গেলে কিংবা সেখানে পেরেক মেরে ফোটো করে দিলে রাষ্ট্র রূপ যানটি আর চলতে পারবে না।

তিনি বলেন, সরকারি দল যা চাইবে বিরোধী দল তার সবকিছু অন্ধভাবে সমর্থন করবে এমনটি যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিরোধিতার খাতিরে সবকিছুর বিরোধিতা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। সংসদীয় কার্যক্রমে তোষামোদির উদ্দেশ্যে গান, কবিতা বা স্বপ্নবিলাসের কোনো স্থান নেই উল্লেখ করে তিনি জনগণকে করের অর্থের সঠিক ব্যবহারের তাগিদ দেন এবং সংসদে যেন অতীতের চরিত্রহননের রাজনীতি আর ফিরে না আসে সে বিষয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দেশের স্বাস্থ্য খাতের তীব্র সমালোচনা করে তিনি নতুন বড় অবকাঠামো বা হাসপাতাল নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে বন্ধ থাকা আদ-দ্বীন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার দাবি জানান।

কওমি ও ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও এ দেশের নাগরিক উল্লেখ করে তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার এবং দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সনদ বিতরণের কেন্দ্র না বানিয়ে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় গভীর হতাশা প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া ২৮ লাখ কোটি টাকার মাত্র নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফেরত আনা যেত, তবে দেশে কোনো বাজেট ঘাটতি থাকত না।

তিনি কেবল সম্পদ নয়, বরং অর্থ পাচারকারী অপরাধীদেরও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। ব্যবসায়ীদের ওপর অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের চাপ কমিয়ে একক ট্যাক্স ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন যাতে তারা কর দিতে উৎসাহিত হন।

মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে চলমান সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের তীব্র সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান জানান, যেখানে মাত্র ৮৫ হাজার টাকায় যাওয়ার কথা, সেখানে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে এবং প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সংসদের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। বাজেট বাস্তবায়নের কঠোর তদারকির জন্য প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর অগ্রগতি প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন এবং জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক অর্থবছর চালুর অভিনব প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা। এছাড়া সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প দ্রুত শেষ করা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, ভোলা সেতু নির্মাণ এবং চীনের সহযোগিতায় প্রধান নদী ব্যবস্থাপনার মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাজেটের সফলতা কেবল কাগজ-কলমে ঘোষণার মধ্যে নয়, বরং এর কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত। অর্থের সংস্থান করার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীত সরকারের রেখে যাওয়া দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মধ্যেও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা প‚রণের লক্ষ্যেই এই কাঠামোগত সংস্কারমুখী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভ‚রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও সঠিক নেতৃত্ব ও দক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আগামী অর্থবছরে সবার জন্য উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনসহ মোট ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন কিছু কঠিন শর্ত থাকায় আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে সরকার স্বপ্রণোদিতভাবে বেরিয়ে এসেছে, তবে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ভবিষ্যতে নতুন দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচির সুযোগ সর্বদা খোলা রয়েছে। 

দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির কার্যকর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।

প্রস্তাবিত ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়, বরং বিনিয়োগ ও উৎপাদনের চাকা সচল করার বাস্তব প্রতিফলন। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে করের হার না বাড়িয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থার অটোমেশনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে গত চার মাসেই প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদায় চার লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে জমে থাকা ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকার ঋণের বোঝা থেকে বের হতে বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার ঘোষণা দেন তিনি।

বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি, যা নিয়ে এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে তা সম্পূর্ণ বাতিল করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যারা জনগণের সম্পদ লুট বা পাচার করেছে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং সাময়িকভাবে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে আপাতত ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন, বাকি অর্থ পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

সংসদের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধিবদ্ধ বিবৃতি ও উন্নয়ন বরাদ্দের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ঐচ্ছিক তহবিল থেকে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকাগুলোর মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহের উন্নয়নের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। তবে সিটি কর্পোরেশন এলাকার অন্তর্গত আসনগুলো আপাতত এই বরাদ্দের বাইরে থাকবে, যা পরবর্তীতে জেলা পরিষদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ দেওয়া হবে।

এই প্রসঙ্গে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার দীর্ঘ ৪০ বছরের সংসদীয় জীবনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, তিনিও দীর্ঘদিন সংসদে বিরোধী দলের সদস্য ছিলেন কিন্তু অতীতে কোনোদিন একটি কানাকড়িও পাননি, বরং পাঁচবার গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যেতে হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ

দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ৩০০ বিধিতে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, দেশের দুটি বড় পাওয়ার স্টেশন কারিগরি ত্রুটির কারণে হুট করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে সঞ্চালন লাইন থেকে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, যার কারণে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক লোডশেডিং দিতে হয়েছিল। তবে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং সোমবার দেশের বিদ্যুতের ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে মাত্র ৩৩৯ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় দেশের কিছু কিছু জায়গায় সাময়িক হালকা লোডশেডিং বজায় থাকলেও তা দ্রুত সম্পূর্ণ দূর করতে সরকার নিরলসভাবে চেষ্টা করছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম

অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংসদের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি তথ্য দিয়ে জানান যে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে প্রতি মাসে যে পরিমাণ টোল বা রাজস্ব আয় হচ্ছে, তার তুলনায় টানেলটির পরিচালন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খাতেই দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। সমাপনী আলোচনা ও অর্থবিলের সংশোধনীর ওপরে অংশ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সরকারের বাজেট কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করেন।

তিনি মন্তব্য করেন, প্রতি বছর বাজেট দেওয়ার সময় আমরা নির্ঝরের মতো রঙিন স্বপ্ন দেখি কিন্তু সারা বছর ধরে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় স্বপ্নভঙ্গের ফল সাধারণ মানুষকে ভোগ করতে হয়। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরায় আপাতদৃষ্টিতে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা মনে হলেও, এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের বাস্তব অক্ষমতার কারণে প্রকৃত ঘাটতি আরও বহুগুণ বেড়ে যায় এবং দেশ ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে।

এছাড়া সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি জানতে চান যে, ওই সফর থেকে চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ কোনো সুনির্দিষ্ট ঋণের আশ্বাস বা নতুন কোনো বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে কিনা, সে বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ধোঁয়াশাপূর্ণ বক্তব্যের সমালোচনা করে সরকারকে সংসদের কাছে প্রকৃত সত্য ও দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট করার জোরালো দাবি জানান।

এসআর/এমএন