বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণসহ ৫ দাবি সাবেক সমন্বয়ক-সংগঠকদের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণসহ ৫ দাবি সাবেক সমন্বয়ক-সংগঠকদের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ, শহীদ-আহত ও সম্মুখসারির যোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ বিচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাঠামোগত সংস্কারসহ পাঁচ দফা দাবি ও প্রস্তাবনা জানিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছা)’ সাবেক সমন্বয়ক ও সংগঠকরা।

বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক নাজমুস সালেহী।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য, মেধার অবমূল্যায়ন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার সংকট এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্ম একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিল। গণঅভ্যুত্থানের প্রায় ২৩ মাস অতিবাহিত হলেও সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান ও গ্রহণযোগ্য অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতি, গণঅভ্যুত্থান নেতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধাবাদী প্রবণতা জনগণের প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম এই সংগঠক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন ও আত্মত্যাগ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পদ হতে পারে না। বরং এটি সমগ্র দেশের জনগণের সম্মিলিত সংগ্রামের ফল। সেই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকেই বৈষম্যহীন সমাজ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পাঁচটি দাবি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরছি।

দাবিগুলো হচ্ছে—

১. রাষ্ট্রীয়ভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ এবং প্রকৃত নেতৃত্বের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। আন্দোলনের সংগঠক, সমন্বয়ক, নেতৃত্বদানকারী ও সফল বাস্তবায়নকারীদের অবদান তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিভাজনকে পুঁজি করে যারা ইতিহাস বিকৃত করছে কিংবা প্রকৃত নেতৃত্বকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, তাদের অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

২. জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও সম্মুখসারির সহযোদ্ধাদের একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও কঠোরভাবে যাচাইকৃত রাষ্ট্রীয় গেজেট প্রকাশ করতে হবে। ইতোপূর্বে প্রকাশিত গেজেটে প্রকৃত অনেক যোদ্ধার নাম বাদ পড়া এবং অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ রয়েছে। তাই নিরপেক্ষ যাচাইয়ের মাধ্যমে তালিকা পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করা জরুরি। সংশোধিত গেজেটভুক্ত আহত যোদ্ধাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে এবং এই গেজেটভুক্ত ব্যক্তিরাই কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।

৩. দেশের বিভিন্ন জাতীয় ট্র্যাজেডি ও বহুল আলোচিত অবিচারের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতা, তনু হত্যাকাণ্ড, ওসমান হালী হত্যাকাণ্ডসহ সব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ী ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক, প্রশাসনিক ও পরিচালনা পর্ষদকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে এখনো স্বৈরাচারী প্রভাববলয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং তাদের ছায়াসঙ্গীদের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, যেখানে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বলয়কে অনৈতিক সুবিধা প্রদান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেখানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।

৫. বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর কাঠামোগত সংস্কার এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বান্ধব উচ্চশিক্ষা নীতি প্রণয়ন করতে হবে। দেশে ১১৬টিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নেই। একই সঙ্গে ইউজিসির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বও অত্যন্ত সীমিত। আমরা দাবি জানাই, ইউজিসিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বান্ধব করে গড়ে তোলা হোক, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগ্য প্রাইভেট শিক্ষকদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুদান ও সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হোক।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য সাবেক সমন্বয়ক ও সংগঠকরা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। কিন্তু প্রায় ২৩ মাস পরও সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। নবগঠিত সরকারের হাতে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশসমূহ বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনার জন্য এখনও প্রায় ৯০ দিন সময় রয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং প্রস্তাবিত অধ্যাদেশসমূহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

তারা আরও বলেন, প্রকৃত ইতিহাসের স্বীকৃতি, ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়িত হবে। সেই লক্ষ্যেই দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বৈছার সাবেক সমন্বয়ক ও সংগঠকরা এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়াত উল্লাহ, ইউআইটিএস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাখাওয়াত হোসেন ইমন, জুলাই যোদ্ধা কামরুল হাসান প্রমুখ।

এমএইচএন/এমএন