চট্টগ্রাম এরিয়ায় বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি (বিওএফ) বা বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা সম্প্রসারণের জন্য প্রতীকী মূল্যে বন্ধ থাকা চট্টগ্রামের জলিল টেক্সটাইল মিলস বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে যাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলের নিয়ন্ত্রণাধীন টেক্সটাইল মিলটি চট্টগ্রাম জেলার ফৌজদারহাট এলাকায় অবস্থিত।
টেক্সটাইল মিলটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বুধবার (১ জুলাই) অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে অনুমোদন পাওয়ায় জলিল টেক্সটাইল মিলসের ৫৪.৯৯ একর জমি প্রতীকী মূল্যে বিওএফ-কে দেওয়া হবে। আর প্রতীকী মূল্য হিসেবে নির্ধারণ করা অর্থ দেওয়া হবে বিটিএমসিকে। বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার পক্ষ থেকে এই অর্থ দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর সেনা সদরের কিউএমজি শাখা বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি সম্প্রসারণের জন্য জলিল টেক্সটাইল মিলসটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়।
এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তরের জন্য ২০২৪ সালের জুনে বিশেষজ্ঞ দলসহ সেনাপ্রধান মিলটি পরিদর্শন করেন। মিলটি চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত এবং নিকটবর্তী সীমান্ত থেকে ৮২ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।
মিলের জমিসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, যাবতীয় পাওনা, আইনগত এবং অন্যান্য বিষয়াদি নিরসন করে প্রতীকী মূল্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনুকূলে হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়।
বিটিএমসির হিসাব অনুযায়ী, জলিল টেক্সটাইল মিলসের কাছে ইউটিলিটি বিলসহ অনেক টাকা পাওনা আছে। এসব পাওনা পরিশোধ ছাড়া সেনাবাহিনী যে উদ্দেশ্যে মিল চাচ্ছে, সে কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। এছাড়া, হস্তান্তর চুক্তি অনুযায়ী সরকারি পাওনা এবং ২০২০-২০২১ সালের অডিট হিসাব অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে মিলের ৫৪.৯৯ একর জমির মধ্যে ৪৬.৯৩ একর জমির মৌজা মূল্য ৬০ কোটি ৯৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯৬৫ টাকা এবং ৮.০৬ একর জমির (আবাসিক) মৌজা মূল্য ৫০ কোটি ৪৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬৯০ টাকা।
জানা গেছে, ব্যক্তি মালিকানায় ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড উপজেলার ফৌজদারহাট এলাকায় মেসার্স জলিল টেক্সটাইল মিলস স্থাপন করা হয়। মিলসটির জমির পরিমাণ ৫৪.৯৯ একর। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করার পর উইভিং এবং ডাইং বিভাগ স্থাপনের মাধ্যমে মানসম্মত উৎপাদনের জন্য ৩ বার স্বর্ণপদক লাভ করে মিলটি।
লাভজনকভাবে পরিচালিত মিলটি বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতিমালার আওতায় ১৯৮২ সালের ১৫ ডিসেম্বর মিলের সাবেক শেয়ার হোল্ডারদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। মালিক পক্ষের মধ্যে কলহের কারণে ১৯৯৭ সালে মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের একপর্যায়ে তৎকালীন সরকার দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১৯৯৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর মিলটি অধিগ্রহণ করে। ওই দিন সরকার মিলের সাবেক ৪০ শতাংশ শেয়ার হোল্ডার সেলিম চৌধুরী গংদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে মিলটি হস্তান্তর করে।
সেলিম চৌধুরী গং মাত্র ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা দিয়ে মিলটি অধিগ্রহণের পর হস্তান্তর চুক্তির ৩ নম্বর শর্তানুযায়ী সরকারি পাওনা ৪ নম্বর শর্তানুযায়ী ৬০ শতাংশ শেয়ার হোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ ৫ ও ৬ নম্বর শর্তানুযায়ী শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ, ৮ নম্বর শর্তানুযায়ী ২০০০ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে মিল চালু, ১০ নম্বর শর্তানুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয়, বস্ত্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রতিনিধি নিয়ে পরিচালনা পর্যষদ না করে চুক্তির সব শর্তই লঙ্ঘন করে। সুচতুরভাবে মালিকপক্ষ ২০০০ সালের শেষের দিকে নামমাত্র ১টি ইউনিট চালু করে পরবর্তীতে শ্রম আইন বহির্ভূতভাবে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনিটটিও বন্ধ করে দেয়।
এ অবস্থায় ২০০৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় মালিকপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৬ মাসের মধ্যে মালিকপক্ষ মিল চালু না করলে হস্তান্তর চুক্তির ১৬ নম্বর শর্তানুযায়ী সরকার মিলটি অধিগ্রহণ করার ঘোষণা দেয়। মালিকপক্ষ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে ২০০৫ সালের ২০ নভেম্বর সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মিলটি বন্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি জলিল টেক্সটাইল মিলস পুনঃগ্রহণ করে সরকার এবং মিলটি বিটিএমসির নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়।
জলিল টেক্সটাইল মিলস্ পুনঃগ্রহণ আদেশের বিরুদ্ধে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুস সেলিম চৌধুরী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (নং-২৬৩০/২০১৭) দায়ের করেন। এই মামলাটি দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহ এবং বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ-এর দ্বৈত বেঞ্চ গত বছরের ১২ জানুয়ারি সেটি ডিসচার্জ করেন অর্থাৎ বিটিএমসির পক্ষে রায় হয়। এ বিষয়ে বিটিএমসির পক্ষে মামলা পরিচালনাকারি আইনজীবী প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে।
পরবর্তীতে মো. আবদুস সেলিম চৌধুরী আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল (নং-২০৮৯/২০২৫) দায়ের করে। এই সিভিল পিটিশন ফর লিভটু আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগে গত ২৯ জুন শুনানি হয়। এক্ষেত্রে রিট পিটিশনটি ডিসমিস হয়েছে মর্মে সরকার পক্ষের আইনজীবী প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।
এমএম/এমএসএ
