কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে ঘিরে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
তাদের আশঙ্কা, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যহাতির চলাচল করিডোর খুটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া করিডোর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়বে।
মঙ্গলবার (১ জুলাই) হাতির চলাচলের করিডোর ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোতে পাঠানো এক চিঠিতে খুটাখালী-ঈদগড় সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চকরিয়ার খুটাখালী থেকে ঈদগড় পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক খুটাখালী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধুশিয়া গর্জন বনের ভেতর দিয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, এই বনাঞ্চল শুধু গাছপালার আধার নয়, এটি মহাবিপন্ন এশীয় হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচল করিডোর। বছরের বিভিন্ন সময়ে বন্যহাতির পাল, এই পথ ব্যবহার করে চলাচল করে। ফলে বনভূমির ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হলে, হাতির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হবে এবং মানুষ-হাতি সংঘাতের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।

তাদের দাবি, খুটাখালী সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাকৃতিক বৃক্ষ ছাড়াও বন বিভাগের আওতায় রোপণ করা অসংখ্য গাছ রয়েছে। একইসঙ্গে এটি বনশূকর, বানর, শিয়াল, বনমোরগ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপসহ নানা বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। সড়ক নির্মাণের জন্য ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত কাজ শুরু হলে, বিপুলসংখ্যক গাছ কাটার আশঙ্কা রয়েছে, যা বনভূমির পরিবেশগত ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পরিবেশবাদীরা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নতুন সড়ক চালু হলে, বনাঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত ও যানবাহনের চলাচল বেড়ে যাবে। এর ফলে বন উজাড়, অবৈধ দখল, বন্যপ্রাণী শিকারসহ বিভিন্ন বনবিরোধী কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক চার লেনে উন্নীত করার ক্ষেত্রে গাছ না কাটার নির্দেশনা দিয়েছেন। একইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬ এবং বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর মাধ্যমে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ অবস্থায় পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা খুটাখালী সংরক্ষিত বন ও হাতির করিডোর রক্ষায় সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন।
এ দাবিতে স্বাক্ষর করেছেন বিভিন্ন পরিবেশ ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। তাদের মধ্যে রয়েছেন খুশি কবির, শামসুল হুদা, মো. আলমগীর কবির, জাকির হোসেন, অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রকল্পটির বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখতে হবে। যদি বনাঞ্চল ধ্বংস করে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি প্রকল্পটির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বন কেটে সড়ক নির্মাণ করা বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশের প্রতিশ্রুতির পরিপন্থি। আমি ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, হাতির চলাচল ব্যাহত হবে এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের মুখে পড়বে। এর ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।
এনামুল হক নাবিদ/জেআই
