বিজ্ঞাপন

ইউএনডিপি ও আইডিআরএ'র যৌথ উদ্যোগ

জলবায়ু ঝুঁকিতে গরিবদের সুরক্ষায় জাতীয় ক্ষুদ্রবিমা কাঠামো

জলবায়ু ঝুঁকিতে গরিবদের সুরক্ষায় জাতীয় ক্ষুদ্রবিমা কাঠামো

দেশের প্রান্তিক ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে একটি যুগোপযোগী এবং সমন্বিত জাতীয় ক্ষুদ্রবিমা (মাইক্রো ইন্সুরেন্স) নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার। দেশের নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী, উপযুক্ত এবং নির্ভরযোগ্য বিমা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) যৌথ অংশীদারিত্বে একটি জাতীয় ইনসেপশন কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এই কর্মশালায় দেশের বিমা খাতের আধুনিকায়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি কার্যকর আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বৃহস্পতিবার (০২ জুলাই) ইউএনডিপির ঢাকা অফিসের হেড অব কমিউনিকেশনস মো. আব্দুল কাইয়ুম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জাতীয় এই কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং বিমা খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য এই উদ্যোগের তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বিমা খাতের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে এখন এমন কিছু উদ্ভাবনী বিতরণ চ্যানেল বা মাধ্যম অন্বেষণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যা খুব সহজেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে। প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন ও চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে বিমা সেবা সাজানোর তাগিদ দেন তিনি।

একই সঙ্গে তিনি একটি উপযুক্ত ও সময়োপযোগী ক্ষুদ্রবিমা নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এই যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশে বিমা সেবার পরিধি বা পেনিট্রেশন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলার শক্তি বহুলাংশে জোরদার হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

কর্মশালায় ইউএনডিপি বাংলাদেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টিটিভ সরদার আসাদুজ্জামান ক্ষুদ্রবিমার মূল দর্শন ও এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিয়ে আলোচনা করেন। 

তিনি বলেন, ক্ষুদ্রবিমাকে কেবল একটি সাধারণ বিমা পণ্য হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটি হচ্ছে চরম সংকটে মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বা সক্ষমতা তৈরির একটি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। 

তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ইউএনডিপি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের এই উদ্যোগের পেছনেও সংস্থাটির একই আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট বা অঙ্গীকার কাজ করছে। 

তিনি বলেন, ইউএনডিপির মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট বা চাপিয়ে দেওয়া বাজার মডেলের দিকে ঠেলে দেওয়া নয়। বরং বাংলাদেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন একটি ক্ষুদ্রবিমা নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরিতে নীতিগত ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া, যা নতুন নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে, সাধারণ গ্রাহক বা ভোক্তার অধিকার ও স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করবে। সার্বিক বিমা বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে এবং দেশের প্রতিটি জায়গায় উপযুক্ত বিমা সমাধানের সুযোগকে বাড়াবে।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন তার বক্তব্যে বিমা ও ক্ষুদ্রঋণ খাতের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের এই দুটি বৃহৎ ও প্রভাবশালী খাতের মধ্যে নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটরি সমন্বয় সাধনের এক বিশাল ও সুদূরপ্রসারী সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো খাতের নিয়মতান্ত্রিক উন্নয়ন করতে গেলে বিদ্যমান আইন বা প্রবিধানকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া বা বাইপাস করা সম্ভব নয়, তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে নিয়মকানুনগুলোকে অবশ্যই সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে অনেক বেশি সহজ ও সাবলীল করা সম্ভব। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি এবং তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি একটি একক সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা যায়, তবেই এমন একটি কল্যাণমুখী কাঠামো তৈরি করা সম্ভব, যা পলিসিধারীদের বা সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ সর্বোচ্চ রক্ষা করার পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিমা সুবিধার পরিধি ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দেবে।

এই কর্মশালায় আইডিআরএ, এমআরএ, দেশের শীর্ষস্থানীয় বিমা কোম্পানি, বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিনির্ভর ইনসুরটেক ফার্ম এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। 

দিনব্যাপী চলা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা ভোক্তা অধিকারের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা, বাজারে বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দায়িত্বশীল ও নিরাপদ উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার জন্য কী ধরনের নিয়ন্ত্রক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বাজার সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেন।

কর্মশালা থেকে উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও সুপারিশগুলোর ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘রেগুলেটরি গ্যাপ অ্যানালাইসিস’ বা নিয়ন্ত্রক ঘাটতি বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘খসড়া ক্ষুদ্রবিমা নিয়ন্ত্রক কাঠামো’ এবং এটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত ‘রোডম্যাপ’ বা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। 

কর্মশালায় বক্তরা জানান, এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশে একটি বাস্তবসম্মত, আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্ষুদ্রবিমা বাজার গড়ে উঠবে, যা একদিকে যেমন নতুন প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক উদ্ভাবনকে স্বাগত জানাবে, অন্যদিকে দেশের নিম্ন আয়ের, সুবিধাবঞ্চিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ঝুঁকিতে থাকা লাখ লাখ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

এসআর/আরএফ