টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র ঢলে লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা।
পাহাড়ি ঢলের তোড়ে কর্ণফুলী ড্রাইডক ও মেরিন একাডেমি সংযোগ সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে ওই রুটে সব ধরনের সরাসরি যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড), মেরিন একাডেমি, কর্ণফুলী ড্রাইডক ও বন্দর কমিউনিটি সেন্টার এলাকার সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন শিল্পাঞ্চলের হাজার হাজার শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণ সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাত থেকে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের সবকটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়েছে তীব্র সংকটে। বিদ্যুৎহীন ও জলমগ্নতায় পুরো উপজেলাজুড়ে এক স্থবিরতা নেমে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার থেকে শুরু হওয়া একটানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একাংশ কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। আজ মঙ্গলবার সকালে কেইপিজেডের পাহাড় থেকে তীব্র গতিতে ঢলের পানি নেমে আসতে শুরু করলে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের উত্তর গুয়াপঞ্চক, বৈরাগ আমানউল্লাহ পাড়া, চাতরী পাঁচ সিকদার বাড়ি ও মোহাম্মদপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়।
এছাড়া ঝোড়ো হাওয়া ও অবিরাম বৃষ্টিতে সিইউএফএল সড়ক, বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া সড়ক, বটতলী শোলকাটা সড়ক, আনোয়ারা সদর এবং চাতরী ইউনিয়নের ইছামতি এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। ঝড়ের তীব্রতায় রায়পুর ইউনিয়নের পূর্ব গহিরা এলাকায় একটি বসতঘর বাতাসে উড়ে গেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। অনেক এলাকার কবরস্থান ও গ্রামীণ সড়কে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গুয়াপঞ্চক এলাকার বাসিন্দা মো. দিদারুল আলম বলেন, ‘সকাল থেকে আমরা পানিবন্দি। এলাকা থেকে পানি নামার কোনো পথ নেই, ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি ঢুকে গেছে। আমার এই বয়সে আনোয়ারায় এমন ভয়াবহ অবস্থা আর কখনো দেখিনি।’
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাতরী চৌমুহনী থেকে সিইউএফএল-মেরিন একাডেমি-কর্ণফুলী ড্রাইডক পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নির্মাণাধীন সড়কের কেইপিজেড জেডি গেইট এলাকায় বর্তমানে একটি বড় কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলছে। এ কাজের জন্য মূল সড়ক বন্ধ থাকায় যাতায়াতের সুবিধার্থে একটি বিকল্প সড়ক (ডাইভারশন) তৈরি করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহের অ্যান্ড ব্রাদার্স।
কিন্তু গতকাল সোমবার বিকেলে পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে সেই বিকল্প সড়কটির একাংশ ধসে যায় এবং পরে সেটি পুরোপুরি তলিয়ে যায়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহের অ্যান্ড ব্রাদার্সের প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুন্না বলেন, ‘টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানির প্রচণ্ড চাপের কারণে ডাইভারশনটি ভেঙে গেছে। মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রেখে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই আমরা সংস্কার কাজ শুরু করেছি। আশা করছি, পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে আগামীকাল বুধবারের মধ্যে সড়কটি পুনরায় চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে।’
২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন পুরো উপজেলা
মঙ্গলবার সকাল থেকে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গতকাল রাত থেকেই মূলত সংযোগের এই অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা আজ বিকেল পর্যন্ত প্রায় ২০ ঘণ্টায় রূপ নিয়েছে।
পল্লী বিদ্যুতের আনোয়ারা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণ ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে লাইনের ওপর গাছপালা ভেঙে পড়েছে। অনেক জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি ও তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের কর্মীরা বৃষ্টি উপেক্ষা করেই মাঠে কাজ করছেন। আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে এবং লাইনের ত্রুটি সারানো সম্ভব হলে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হবে।’
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দীন বলেন, ‘কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি। বিশেষ করে কেইপিজেড সংলগ্ন ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি দ্রুত সচল করতে সওজ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি মানুষের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে।’
এমআর/বিআরইউ
