বিজ্ঞাপন

জাতীয় সংসদে তোলপাড়

ফ্যাসিস্ট দোসরদের খোঁজা হচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কায় বিরোধী দল

ফ্যাসিস্ট দোসরদের খোঁজা হচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কায় বিরোধী দল

জাতীয় সংসদের অধিবেশনজুড়ে মঙ্গলবার সরকারি চাকরিতে বিশাল শূন্যপদ পূরণ, বিচার বিভাগে মামলার জট নিরসন, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং রাজনীতি ও স্বাস্থ্য খাতের নানা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পাশাপাশি কয়েকটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। অধিবেশনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী দেশের বর্তমান জনবল ও শূন্যপদের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন।

টানা ছয়দিনের বিরতির পর মঙ্গলবারের অধিবেশনে আইন পাস ও জনবল সংকটের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বিষয়টিই ছিল মূল ফোকাসে। বিশেষ করে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করার সরকারি উদ্যোগ এবং প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্বলিত কঠোর আইনের আইনি রূপরেখা সংসদ সদস্যদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে একই সাথে চিকিৎসা ব্যয়ের মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয়ে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি এবং বিরোধী দলীয় সমাবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি সংসদীয় গণতন্ত্রের চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন বার্তা দিয়েছে।

প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান ও ৫ লাখ শূন্যপদের মহাপরিকল্পনা

অধিবেশনের শুরুতেই প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের জনপ্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের বর্তমান চালচিত্র এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী। কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী দেশের বর্তমান জনবল কাঠামোর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকলেও এখনও ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ সম্পূর্ণ শূন্য রয়েছে। 

এই বিশাল শূন্যতা মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক গতিশীলতাকে ব্যাহত করছে স্বীকার করে তিনি বলেন, সরকার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ৪৪তম বিসিএস থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে নিয়োগের সময়সীমা কমিয়ে আনা হচ্ছে, যেখানে ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল মাত্র ১ বছর ৭ মাসের মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৫০তম বিসিএসের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাত্র এক বছরের মধ্যে সমস্ত পরীক্ষা ও মূল্যায়ন শেষ করে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

তবে নিয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য সংসদ কক্ষকে নাড়া দেয়। তিনি কড়া ভাষায় সাফ জানিয়ে দেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বসে যারা প্রকাশ্যে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য এবং জনগণের অধিকার হরণে কাজ করেছেন, সরকারের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করার কাজ পুরোদমে চলমান রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়ন শেষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এ ছাড়া গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিমের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে কোনো কর্মকর্তার নৈতিক স্খলন বা দুর্নীতি নজরে এলে তাৎক্ষণিক সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। এই সমস্ত শাস্তিমূলক ও নৈতিক স্খলনের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ‘ডোসিয়ারে’ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে তাদের পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন বা লিয়েন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়াভাবে বিবেচনা করা হবে।

বিচার বিভাগে ৪৬ লাখ মামলার পাহাড় ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার

এদিকে বিচার বিভাগের ওপর ঝুলে থাকা মামলার পাহাড় নিয়ে সংসদে এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, দেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ এবং দেশের সব অধস্তন (নিম্ন) আদালত মিলিয়ে বর্তমানে মোট ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে কেবল উচ্চ আদালতেই মামলার সংখ্যা সাড়ে ৫ লাখের বেশি। চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। 

মন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালে উচ্চ আদালতের দুই বিভাগ মিলিয়ে মোট ৬৩ হাজার ৩০৯টি মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে, যা চলমান জটের তুলনায় বেশ কম। নিম্ন আদালতগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ, যেখানে ১৬ লাখ ৯০ হাজার দেওয়ানি এবং ২৩ লাখ ৮৭ হাজারের বেশি ফৌজদারি মামলাসহ মোট ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা ঝুলে আছে। এই বিশাল মামলার জটকে দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে মন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে, সরকার বিচারকের সংখ্যা ও আদালতের সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে ৫৩৬টি নতুন বিচারকের পদ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আরও ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়াও দ্রুত গতিতে চলছে।

এর পরপরই সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২ পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং বর্তমানে উভয় ট্রাইব্যুনালে নিয়মিত বিচার কার্যক্রম চলছে। তবে পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার যেন ক্ষুণ্ন না হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই বিচার যেন শতভাগ গ্রহণযোগ্যতা পায়, সেজন্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) রুলস অব প্রসিডিউর, ২০১০-এর বিধি অনুযায়ী ১৭টি মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সরকারি খরচে ৪৪ জন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীকে ‘স্টেট ডিফেন্স ল’ইয়ার’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং শুধু প্রকৃত অপরাধীদেরই বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায়।

চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কা ও সংসদীয় কমিটির ওপর ক্ষোভ

সংসদ অধিবেশনের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল দেশের একমাত্র পুরোদস্তুর চালুরত টারশিয়ারি লেভেলের চিকিৎসাকেন্দ্র ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়’ (সাবেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) সংক্রান্ত নতুন সংশোধনী বিল নিয়ে তীব্র বিতর্ক। বিলটির ওপর বিশেষ কমিটির রিপোর্ট উত্থাপনের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই বিলের মাধ্যমে যদি এই শীর্ষ চিকিৎসাকেন্দ্রটিকে প্রফিট ও নন-প্রফিট কনসার্নে ভাগ করে কর্পোরেট বা বেসরকারি শেয়ারিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়, তবে প্রতিষ্ঠানটি মূলত একটি লাভজনক ব্যবসায়িক কোম্পানিতে রূপ নেবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসার খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা দেশের কোটি কোটি সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

তিনি আরও বলেন, চলতি অধিবেশনে বাজেট পাস করার সময় আমরা জনগণের চিকিৎসা ব্যয় বা ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, যা সবাই সমর্থন করেছিল। কিন্তু এই বিলের চেতনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে বেসরকারি পুঁজি ঢুকলে একটি অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা সাধারণ মানুষের প্রাপ্তির চেয়ে একটি নির্দিষ্ট পুঁজিপতি গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করবে। স্পিকার এ সময় বিরোধীদলীয় নেতাকে আশ্বস্ত করে বলেন, বিলটি কেবল উপস্থাপিত হয়েছে, পরবর্তীতে যখন এটি ধারাওয়ারী পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনার জন্য আসবে, তখন এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য তাকে দীর্ঘ সময় দেওয়া হবে।

এই বিলের উপস্থাপনের পরপরই সংসদের বিশেষ কমিটির বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতা ও খামখেয়ালিপনার অভিযোগ তুলে ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এ দাঁড়ান বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিলের কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে যথাসময়ে সভার নোটিশ দেওয়া হয়নি। সকাল ১০টায় কমিটির মিটিং, অথচ তাকে কমিটির সভাপতির পিএস ফোন দিয়েছেন ১০টা ১৯ মিনিটে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সকাল ৯টা ১৯ মিনিটে তাকে একটি খুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি সংসদীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভার খবর কি বৈঠক শুরুর মাত্র ৪০ মিনিট আগে মেসেজে দেওয়া যায়? এত কম সময়ে প্র্যাক্টিক্যালি কোনো সদস্যের পক্ষে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নয়।

সংসদ সদস্যের এই যৌক্তিক অভিযোগের পর স্পিকার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বিশেষ কমিটির সভাপতিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে আরও যত্নবান ও সতর্ক হওয়ার কঠোর নির্দেশ দেন। স্পিকার বলেন, সংসদে বা সংসদের বাইরেও এটি একটি অত্যন্ত নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে যে সংসদ সদস্যরা মিটিংয়ের নোটিশ পান না। ভবিষ্যতে যাতে প্রত্যেক সদস্যকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে নোটিফাই করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সংসদে হাস্যরস ও রাজপথের রাজনীতি নিয়ে উত্তেজনা

সংসদ অধিবেশনে গতকাল বেশ কিছু রসাত্মক এবং একই সাথে রাজনৈতিকভাবে হাস্যরসের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর, ভেড়ামারা, মিরপুর ও কুমারখালী অঞ্চলের নদীপথের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং জলদস্যু ও সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যের কথা উল্লেখ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর কাছে নৌ-পুলিশের ফাঁড়ি বা থানা স্থাপনের জোরালো দাবি জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আওতাধীন নৌ-পুলিশের দাবি প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর কাছে তোলায় স্পিকার ও মন্ত্রীর মন্তব্যে পুরো সংসদ কক্ষে হাসির রোল পড়ে।

স্পিকার রসিকতা করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনার আন্ডারে থানা-পুলিশ কিছু আছে কি-না, উত্তর দিন। জবাবে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী হেসে বলেন, পুলিশ তো আমার হাতে নেই। তবে আমার কাছে মুরগি আছে। তিনি আরও যোগ করেন, ওই এলাকায় যদি তার মন্ত্রণালয়ের রিজার্ভের মাছ কেউ অবৈধভাবে ধরে, তবে সেই উসিলায় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করে কিছু পুলিশ পাঠাতে পারেন, এর বাইরে তার কিছু করার নেই। পরে স্পিকার ফরিদা ইয়াসমিনকে বিষয়টি যথাযথ মন্ত্রণালয় অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে উত্থাপনের পরামর্শ দেন।

হাস্যরসের এই আবহ কাটিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সাভারে রাজপথের বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পথযাত্রা’ কর্মসূচির সমাবেশে হামলার ঘটনায়। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভ ও ক্ষুরধার বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত সোমবার সাভারে আয়োজিত সমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত হওয়ার ঠিক আগে রহস্যজনকভাবে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং অন্ধকারের মধ্যেই বক্তব্য চলাকালে সমাবেশস্থলে হঠাৎ একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বহু নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত হন। 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা যখনই জুলাইয়ের চেতনাকে কেন্দ্র করে কোনো আন্দোলন বা কর্মসূচি ঘোষণা করি, তখনই একটি নির্দিষ্ট কুচক্রী মহল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিরোধী দলের সাংবিধানিক সভা-সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সরকারের পক্ষে জবাব দিতে উঠে সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, সাভারের ঘটনাটি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং হামলার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশ্নফাঁস রোধে ঐতিহাসিক নতুন আইন ও বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল

অধিবেশনের শেষভাগে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও কঠোরতা এনে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বিলটি উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। প্রায় ৪৫ বছরের পুরোনো ১৯৮০ সালের আইনটিকে আধুনিকায়ন করে এবারই প্রথম এই আইনে ‘ডিজিটাল কারসাজি’ এর স্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় পাবলিক পরীক্ষার ডাটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশ, হ্যাকিং, তথ্য পরিবর্তন, সংশোধন বা ফলাফল মুছে ফেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, ডিজিটাল কারসাজির অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি পরীক্ষাকক্ষে নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ করলে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং প্রশ্নপত্র বা উত্তরপত্র পরীক্ষার আগে নিজের কাছে রাখলে বা ফাঁস করলে পাঁচ বছরের জেলের বিধান রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের খামখেয়ালিপনা বা কারসাজি ঠেকাতেও কঠোর ধারা যুক্ত করা হয়েছে; ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দিয়ে ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে শিক্ষকদেরও দুই বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে এই আইনে সৎ উদ্দেশ্যে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য প্রকাশকারী তথ্যদাতাদের (হুইসেলব্লোয়ার) দেওয়ানি, ফৌজদারি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা থেকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে এবং সব অপরাধকে আমলযোগ্য করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, ২০০১ সালের একটি অকার্যকর আইন বাতিল করে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ায় বিজ্ঞান, জীবনবিজ্ঞান, প্রকৌশল, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, আইন, কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ সব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ-সংবলিত একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন শিক্ষামন্ত্রী। বিলটি অধিকতর যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে এবং আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংসদে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসআর/এমএন

বিজ্ঞাপন