বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়ার দাবি

জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়ার দাবি

বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন, সশস্ত্র সংঘাত, জলবায়ু সংকট, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং ঋণগ্রস্ততার মতো বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের আগামী মহাসচিবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংকটকালীন এমন সময়ে জাতিসংঘের নেতৃত্ব নির্বাচন কেবল একজন ব্যক্তি বাছাইয়ের বিষয় নয়, বরং এই বৈশ্বিক সংস্থাটিকে প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), সাউদার্ন ভয়েস এবং ‘১ ফর ৮ বিলিয়ন’ ক্যাম্পেইনের যৌথ উদ্যোগে ‘বহুধাবিভক্ত বিশ্বে জাতিসংঘের নেতৃত্ব পুনর্ভাবনা : বাংলাদেশ কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক একটি ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়।

আলোচনায় ভবিষ্যৎ জাতিসংঘের নেতৃত্ব নির্ধারণে প্রয়োজনীয় গুণাবলি এবং নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ব বর্তমানে সবচেয়ে জটিল সময় পার করছে। আগামী জাতিসংঘ মহাসচিবের অবশ্যই সততা, স্বাধীনতা, পেশাদারিত্ব, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং মোরাল অথরিটি থাকতে হবে, যাতে তিনি জাতিসংঘের সনদের নীতিমালার প্রতি অনুগত থেকে সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে পারেন।

তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক সাধারণ পরিষদের কাছে মাত্র একটি নাম সুপারিশ করার বর্তমান নিয়মটি পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই বা পছন্দের সুযোগ দেয় না। এর পরিবর্তে তিনি একটি উন্মুক্ত, মেধাভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার দাবি জানান। নিরাপত্তা পরিষদ একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা (শর্টলিস্ট) তৈরি করে সাধারণ পরিষদে পাঠাতে পারে, যাতে ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত মেধা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে অবশ্যই ছোট-বড়, উন্নত-উন্নয়নশীল নির্বিশেষে সব দেশের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হতে হবে।

অনুষ্ঠানের সভাপতি সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই আলোচনা কেবল নেতৃত্ব নিয়ে নয়, বরং এটি বহুপাক্ষিকতার ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। আগামী মহাসচিব নির্বাচন কেবল একজন ব্যক্তি নির্বাচন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানটিকে কীভাবে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করা যায় তার প্রতিফলন হতে হবে। নেতৃত্ব যদি সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে চায়, তবে স্বচ্ছ নির্বাচন, শক্তিশালী জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য কূটনৈতিক দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক কর্তৃত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলার স্বাধীন ক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি। অনুষ্ঠানটি একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ার জোরালো আহ্বানের মাধ্যমে শেষ হয়।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আফরিন মাহবুব জানান, বর্তমান মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়াটি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য দেশের দ্বারা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত, যেখানে প্রার্থী ও তাদের ভিশন স্টেটমেন্ট প্রকাশ ছাড়া বাকি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জাতিসংঘের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিব হননি এবং পুরো জাতিসংঘ ব্যবস্থায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনও কম।

বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, শীর্ষ পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি নারী নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত এবং প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব সব সময় প্রকৃত প্রভাব নিশ্চিত করে না। সুশীল সমাজের মতামতের ভিত্তিতে তিনি বলেন, কেবল লিঙ্গভিত্তিক প্রতিনিধিত্বই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

‘১ ফর ৮ বিলিয়ন’ ক্যাম্পেইনের উপদেষ্টা বেন ডোনাল্ডসন বলেন, মনোনয়ন পর্ব প্রায় শেষের দিকে হলেও স্থায়ী সদস্যদের প্রভাবের কারণে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্দার আড়ালের গোপন সমঝোতা পুরো জাতিসংঘের নেতৃত্ব ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে দুর্বল করে দেয়।

সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার লিমা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফৌজিয়া মোসলেম এবং সিপিডি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশি কবির সম্মানিত প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন। 

আরএম/এসএএস