বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়নের পরিমণ্ডলে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। অনুদান বাজেট হ্রাস, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং দাতা দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান রাজস্ব চাপের কারণে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে প্রধান দাতা দেশগুলোর বহুপাক্ষিক অবদান ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়ন, সহজ শর্তে ঋণ এবং এলডিসি উত্তরণ সংক্রান্ত অর্থায়নে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
বুধবার (৮ জুলাই ২০২৬) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংলাপে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়।
‘ওইসিডি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ২০২৬ প্রতিবেদন (এমডিএফআর): দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক অধিবেশনে দুই অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৪ সালেই বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক অনুদান কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। ২০২৩ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রধান দাতা দেশগুলোর সামগ্রিক অবদান ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার পূর্বাভাস। কেন্দ্রীয় বহুপাক্ষিক সংস্থার বাজেট কর্তনের কারণে ‘রিভার্স লিভারেজ ইফেক্ট’-এর সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিক ডেলিভারি চেইন এবং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করবে।
সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে ওইসিডির গবেষক ও এমডিএফআর ২০২৬-এর সহ-লেখক লিওনার্দো আলটিয়েরি জানান, বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থা বর্তমানে সম্পদ সংকোচনের এক ভিন্ন ও জটিল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ২০২৪ সালে মূল এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বরাদ্দ করা উভয় ধরনের অবদান হ্রাস পাওয়ার কারণে মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক অনুদান প্রায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে।
প্রতিবেদনের আরেক সহ-লেখক মারিয়াস গেরিন সতর্ক করে বলেন, যদিও ২০২৪ সালে বহুপাক্ষিক বহিঃপ্রবাহ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল, তবে এটি মূলত বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থার গভীর টানাপোড়েনের প্রাথমিক লক্ষণকে আড়াল করে রাখছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দাতা দেশগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সীমাবদ্ধতার সময়ে এই সহজ শর্তের তহবিলগুলোই সবার আগে হ্রাস করে থাকে।
সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এই প্রতিবেদনটিকে কেবল সাহায্য হ্রাসের সতর্কতা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং আগামী দশকগুলোতে কীভাবে উন্নয়নের অর্থায়ন করা হবে তা পুনর্বিবেচনা করার একটি বড় আহ্বান হিসেবে নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ, পুঁজিবাজার সংস্কার, বন্ড বাজারের উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি বহুমুখী অর্থায়ন কৌশল অনুসরণ করছে।
অন্যদিকে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থা এখন ‘একটি ঐতিহাসিক মোড়’-এ পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পর্যন্ত অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক খাতে উন্নয়ন অর্থায়ন থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থায়নের এই নেতিবাচক উল্টো গতি বাংলাদেশের আসন্ন এলডিসি উত্তরণের সময়ে নতুন এবং জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, যা টেকসই প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করার ঝুঁকি রাখে।
পাকিস্তানের এসডিপআই'র নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কাইয়ুম সুলেরি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত বহুপাক্ষিক অর্থায়ন রক্ষা ও এর সুশাসন নিশ্চিত করতে ‘একক কণ্ঠে’ কথা বলা।
নেপালের সাওতির ড. পারস খরেল এবং শ্রীলঙ্কার সিইপিএ-এর ড. রোশান অ্যান পেরেরা এলডিসি উত্তরণ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সহজ শর্তে ঋণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ভার্চুয়াল সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন কাঠামোর সংস্কার গঠনে আরও সক্রিয়ভাবে জড়িত হতে হবে, পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ শক্তিশালী করতে হবে এবং সাশ্রয়ী ও অনুমানযোগ্য অর্থায়নে ক্রমাগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
আরএম/এসএম
