বিজ্ঞাপন

তদন্ত প্রতিবেদন

বান্দরবান সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মিথ্যা

বান্দরবান সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মিথ্যা

বান্দরবান জেলা সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের বিপরীতে মাত্র ১ কোটি টাকার মালামাল কিনে বাকি ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছিল, তদন্তে তার সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটি বলেছে, বাস্তব যাচাইয়ে অধিকাংশ ওষুধ, চিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসা সরঞ্জাম (এমএসআর) হাসপাতালে মজুত থাকার প্রমাণ মিলেছে এবং অতিরিক্ত ৩ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়টি সঠিক নয়।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার কোটি টাকার টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ উঠে। প্রায় চার কোটি টাকার ওষুধ সামগ্রী ক্রয়ের টেন্ডারে এক কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর ২৯ জুন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ১ জুলাই কমিটি বান্দরবান সদর হাসপাতালের বিভিন্ন স্টোর সরেজমিনে পরিদর্শন করে। এ সময় হাসপাতালের স্টোরকিপার ও কার্যাদেশপ্রাপ্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকা পোস্টের হাতে আসা তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ই-জিপি পদ্ধতিতে তিনটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০টি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : এমএসএম বাংলাদেশ, এমএসএম হেলথকেয়ার এবং মেসার্স আলমগীর অ্যান্ড ব্রাদার্স। এসব কার্যাদেশের আওতায় ২৯৪টি চিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের আদেশ দেওয়া হয়, যার মোট মূল্য ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৬৩ হাজার ৭১০ টাকা।

তদন্তে দেখা যায়, পরিদর্শনের সময় পর্যন্ত ২৯৪টি আইটেমের মধ্যে ৪৩টি আইটেম আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে হাসপাতালে পৌঁছায়নি। এসব আইটেমের মূল্য ৪৯ লাখ ৩৬ হাজার ৪১৬ টাকা, যা মোট মূল্যের প্রায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে এসব পণ্য সরবরাহ সম্ভব হয়নি বলে জানান এবং ১৫ দিনের মধ্যে অবশিষ্ট মালামাল সরবরাহের আশ্বাস দেন।

কমিটি বাকি ২৫১টি আইটেমের মধ্যে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে প্রায় ৫০টি আইটেমের মজুত যাচাই করে পরিমাণের সঙ্গে নথিপত্রের মিল পেয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১ জুলাই পর্যন্ত আইটেমের হিসাবে প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং মূল্যের হিসাবে প্রায় ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। বাস্তব যাচাইয়ে অধিকাংশ মালামাল স্টোরে পাওয়া যাওয়ায় ৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটি আরও জানায়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এখনো জেলা পরিষদের হিসাব ও নিরীক্ষা শাখা থেকে তাদের নামে ইস্যু করা চেক নেননি। ফলে এমএসএম বাংলাদেশের ১ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৮ টাকা, এমএসএম হেলথকেয়ারের ১ কোটি ৫২ লাখ ৯৫ হাজার ২৮১ টাকা এবং মেসার্স আলমগীর অ্যান্ড ব্রাদার্সের ১০ লাখ ১৯ হাজার ৩২০ টাকার তিনটি চেক এখনো হিসাব ও নিরীক্ষা শাখায় সংরক্ষিত রয়েছে।

তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেছে, কার্যাদেশ অনুযায়ী সব চিকিৎসাসামগ্রী বান্দরবান সদর হাসপাতালের স্টোরে বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত এবং সিভিল সার্জনের লিখিত প্রত্যয়ন ছাড়া কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চেক হস্তান্তর করা যাবে না।

তদন্ত কমিটির সদস্য ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক ডা. লেলিন তালুকদার বলেন, তদন্ত কমিটি সরেজমিনে হাসপাতালের স্টোরে গিয়ে মালামাল যাচাই করেছে। নথিপত্র এবং বাস্তব মজুত মিলিয়ে দেখা হয়েছে। যাচাইয়ে অধিকাংশ চিকিৎসাসামগ্রী স্টোরে পাওয়া গেছে। ফলে সিভিল সার্জন ১ কোটি টাকার ওষুধ কিনে ৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত উত্তোলন করেছেন— এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে, কার্যাদেশ অনুযায়ী সব চিকিৎসাসামগ্রী স্টোরে বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত এবং সিভিল সার্জনের প্রত্যয়ন ছাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চেক হস্তান্তর না করার সুপারিশ করা হয়েছে।

আরএমএন/এসএএস