বিজ্ঞাপন

এলডিসি উত্তরণের ধাক্কা সামলাতে নতুন সমীকরণ

ভারতের ‘সেপা’ ও ৮ দেশের সঙ্গে চলছে বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষি

ভারতের ‘সেপা’ ও ৮ দেশের সঙ্গে চলছে বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষি

২০২৬ সালের পর বিশ্ববাজারে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে বহুমাত্রিক বাণিজ্য কৌশল ও নীতিগত সংস্কারের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। একদিকে ভারতের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যেমন ‘সেপা’ চুক্তির আলোচনা শুরু হয়েছে, অন্যদিকে জাপান, চীন ও ইইউসহ আটটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) দরকষাকষি চলছে।

বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ তথ্য জানান।

সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য উন্নত বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার, সহজ ‘রুলস অব অরিজিন’ এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধায় পরিবর্তন আসতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি খাতের জন্য অনুকূল রুলস অব অরিজিন, শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার বজায় রাখতে ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, ইইউর জিএসপি প্লাস স্কিমের যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩২টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নের ওপর সরকার বিশেষ জোর দিয়েছে এবং এই ব্লকের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছে।

রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানের সঙ্গে ইতোমধ্যে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং চীনের সঙ্গে ইপিএ, সেপা এবং এফটিএ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া কানাডার ‘জেনারেল প্রেফারেন্সিয়াল ট্যারিফ প্লাস’ সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী নীতিগত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন (ভ্যালু এডিশন) বৃদ্ধি, মানবসৃষ্ট আঁশভিত্তিক (ম্যান-মেড ফাইবার) উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং পাট, চামড়া, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল ও আইসিটি খাতের সক্ষমতা বাড়িয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের কাজ চলছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং শুল্ক ও অসম বাধা দূর করতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়েও সরকার তৎপর রয়েছে।

রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমানের অপর এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে একটি ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সেপা স্বাক্ষরের আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, পণ্য ও সেবা বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা শক্তিশালী করতে দুই দেশই একটি ‘সেপা’ চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটি যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিক আলোচনার অংশ হিসেবে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করেছে।

সংসদে দেওয়া মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১.৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে ১.৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ভারতের সঙ্গে এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে সরকার অভ্যন্তরীণ শিল্পের বিকাশ, আমদানি-বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করা এবং অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেছে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।

এসআর/এসএম