বিজ্ঞাপন

রেসকিউ হেলিকপ্টার-ড্রোন পাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস, পরিণত হবে আধুনিক বাহিনীতে

রেসকিউ হেলিকপ্টার-ড্রোন পাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস, পরিণত হবে আধুনিক বাহিনীতে

আগুন নেভানোর প্রচলিত ভূমিকা থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম— পূর্ণাঙ্গ এমন বাহিনীতি রূপান্তর করা হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে। এ লক্ষ্যে প্রায় ২০০ জনবল নিয়োগ, ২৯টি নতুন ফায়ার স্টেশন, ৭৩টি অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার ইউনিট, প্রতিটি বিভাগের জন্য রেসকিউ হেলিকপ্টার, পর্যায়ক্রমে ৫০০ সার্চ-সার্ভেল্যান্স ড্রোন, উপজেলাভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টার (ইআরসিসি), ফায়ার রেসকিউ সেন্টার এবং বিশেষায়িত ফায়ার সার্ভিস একাডেমি প্রতিষ্ঠাসহ একগুচ্ছ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। 

একই সঙ্গে ভূমিকম্প মোকাবিলা, ডুবুরি ইউনিট সম্প্রসারণ, ফায়ার সেফটি কোড প্রণয়ন এবং হাসপাতাল চালুর মতো উদ্যোগও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা দেশের জরুরি সেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জন্য নেওয়া এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সংস্থাটি কেবল অগ্নিনির্বাপণকারী বাহিনী হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক মানের একটি সমন্বিত জরুরি সেবা ও দুর্যোগ মোকাবিলা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। জনবল বৃদ্ধি, নতুন ফায়ার স্টেশন, রেসকিউ হেলিকপ্টার, সার্চ ড্রোন, আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স, জাতীয় সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট, ডুবুরি ইউনিট সম্প্রসারণ এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন দেশের জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে তারা বলছেন, প্রকল্প অনুমোদনই শেষ কথা নয়; নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত বাজেট এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

নির্মাণ হবে নতুন স্টেশন, হবে সম্প্রসারণ ও শ্রেণি উন্নীতকরণও
ফায়ার সার্ভিসের সেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে কক্সবাজারের চকরিয়া ফায়ার স্টেশনকে ‘বিশেষ শ্রেণি’ এবং পেকুয়া স্টেশনকে ‘এ শ্রেণি’তে উন্নীত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় একটি বিশেষ শ্রেণির ফায়ার স্টেশন এবং চকরিয়ার পশ্চিম বড় ভেওলা এলাকায় একটি ‘এ শ্রেণি’র ফায়ার স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রকল্প দলিল প্রস্তুতের কাজ চলছে। 

এ দিকে স্টেশনবিহীন উপজেলা, দুর্গম এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা (কেপিআই) এলাকায় জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে নতুন ২৯টি ফায়ার স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ২৩টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি নতুন এবং চারটি পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে পরিচালিত অস্থায়ী ফায়ার স্টেশনকে স্থায়ী জনবল দিয়ে পরিচালনার জন্যও রাজস্ব খাতে পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে দুর্ঘটনায় দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রথম ধাপে ৫০টি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্প্রসারণে পৃথক প্রকল্প নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ফায়ার রেসকিউ সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা, ভবন ধস, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ সব ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।

জাতীয় উদ্ধার ইউনিট ও রেসকিউ হেলিকপ্টারও পরিকল্পনার ছকে
সূত্র জানিয়েছে, বড় ধরনের দুর্যোগে দ্রুত সমন্বিত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতীয় সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি বিভাগের জন্য পৃথক রেসকিউ হেলিকপ্টার সংগ্রহের প্রকল্পও প্রণয়ন করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে পর্যায়ক্রমে ৫০০টি সার্চ ও সার্ভেল্যান্স ড্রোন কেনা হবে। এ ছাড়া কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৭৩টি অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার ইউনিট মোতায়েনের প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফায়ারফাইটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক ৩০০ সেট পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়া ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় জরাজীর্ণ ফায়ার স্টেশন পুনর্নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৪০০ জন কমিউনিটিভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হবে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে ভূমিকম্প বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে ২০টি যৌথ মহড়া (মক ড্রিল) আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বড় ধরনের দুর্যোগে দ্রুত সমন্বিত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতীয় সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি। 

নেওয়া হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস জেনারেল হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ
ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ফায়ার সেফটি কোড-২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন-২০০৩ এবং ফায়ার সার্ভিস বিধিমালা-২০১৪ সংশোধনের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জনবল পাওয়া সাপেক্ষে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ফায়ার সার্ভিস জেনারেল হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবে ৭৬টি সহকারী পরিচালকের পদ সৃজন এবং সমসংখ্যক উপসহকারী পরিচালক ও সমমানের পদ পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে পাঁচটি বহুতল অফিস-কাম-আবাসিক ভবন নির্মাণ, বিভাগীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২টি স্টোরেজ-কাম-শেড নির্মাণ এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

ফায়ার সার্ভিসের রাজস্ব আয়ও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আয় হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ আয় ৩৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে শতভাগ ই-জিপি পদ্ধতি অনুসরণ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক মো. সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ফায়ার সার্ভিসকে শুধু অগ্নিনির্বাপণকারী বাহিনী হিসেবে দেখার সময় শেষ। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, বহুতল ভবন, শিল্পায়ন ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির কারণে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স এজেন্সি’তে রূপান্তর করতে হবে। সরকার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা সময়োপযোগী। তবে শুধু প্রকল্প অনুমোদন নয়, জনবল, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারলেই এর সুফল পাওয়া যাবে।

আগুন নেভানোর প্রচলিত ভূমিকা থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম— পূর্ণাঙ্গ এমন বাহিনীতি রূপান্তর করা হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কোথায় স্টেশন হবে, কত সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো যাবে এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সেটির সমন্বয় কতটা হচ্ছে, এসব বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকাসহ বড় শহরে ট্রাফিক ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ অনেক সময় আধুনিক যন্ত্রপাতিকেও অকার্যকর করে দেয়। তাই স্টেশন নির্মাণের পাশাপাশি জরুরি যান চলাচলের জন্য বিশেষ করিডর ও নগর পরিকল্পনায় অগ্নিনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মুহাম্মদ শামসুদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ড্রোন, রেসকিউ হেলিকপ্টার বা আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম কেনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য দক্ষ অপারেটর, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট এবং একটি শক্তিশালী কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা না থাকলে এসব বিনিয়োগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না। তাই অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন বলেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে সময়োপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আরও কার্যকর একটি জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। জনবল বৃদ্ধি, নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপন, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

একই সঙ্গে নিয়োগ, ক্রয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হলে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ, উদ্ধার ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক জরুরি সেবা সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আমরা আশাবাদী। 

এমএম/এনএফ