দেশের রাজস্ব ঘাটতি পূরণ এবং চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ধনী ও কর্পোরেটদের কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে দ্বিতীয় অধিবেশনে দুটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও ধনীদের কর ফাঁকি বন্ধ করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর আদায়ের প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ করতে কর্পোরেট করদাতাদের জন্য খুব শিগগিরই ই-রিটার্ন ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে করদাতাদের তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে এপিআই সংযোগের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ চলছে। কোনো খাত থেকে কী পরিমাণ কর আসা উচিত, তা যাচাই করতে বিভিন্ন শিল্পখাতভিত্তিক গড় সূচক ব্যবহার করে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া অনলাইনে উৎসে কর কর্তন ব্যবস্থাপনার পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ সম্পর্কে গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নেরও উত্তর দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বিগত ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে দেশের অর্থনীতিতে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছিল, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে তা ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কমতে শুরু করেছিল। ধারাবাহিক পতন শেষে ২০২৫ সালের অক্টোবরে পয়েন্ট টু পয়েন্টভিত্তিক হেডলাইন মূল্যস্ফীতি ৮.১৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে পরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন অভিঘাতের ফলে মূল্যস্ফীতি আবার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯.৪২ শতাংশে দাঁড়ায়।
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজারে অতিরিক্ত চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশের মতো উচ্চস্তরে বহাল রেখেই চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি কেবল চাহিদার কারণে নয়, বরং পণ্যের জোগান কমে যাওয়ার কারণেও হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হওয়া এবং বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়েছে। এই জোগান সংকট কাটাতে এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক এরইমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্যাকেজটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে।
এই প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে বাজারে নতুন করে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি বা টাকার অবমূল্যায়ন ঘটবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকাই আসবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে, আর বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ করবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সামলাতে এবং ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে, যা দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
এসআর/জেডএস
