একসময় শহুরে ছাদ মানেই ছিল খোলা-ফাঁকা জায়গা। শুকানো হতো জামাকাপড়। এখন অনেকের ছাদেই গড়ে উঠছে শাকসবজি কিংবা ফল-ফুলের বাগান। বদলে যাওয়া নগরজীবনের এ প্রভাব পড়েছে গাছের বাজারেও। চাহিদা বাড়ছে ছাদবাগান উপযোগী ছোট আকারের দেশি-বিদেশি নানা জাতের চারার। তবে মানুষকে আরও আগ্রহী করে তুলতে উৎসাহ দিচ্ছে বন বিভাগ। ছাদবাগানে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মিলছে নগদ টাকাসহ জাতীয় পুরস্কারও।
জাতীয় বৃক্ষমেলায় আগে সাধারণত আম, কাঁঠাল, লিচুর পরিচিত চারাই খুঁজতেন ক্রেতারা। আধুনিকায়নের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। মেলায় এসে বেশিরভাগ মানুষই ডোয়ার্ফ, সেমি-ডোয়ার্ফ, বিদেশি, আগাম, মধ্য ও লেট জাতের ফলগাছের খোঁজ করছেন। ছাদবাগানের চাহিদার কারণেই বাজারে নতুন নতুন জাতের চারার সরবরাহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন নার্সারি মালিকরা।
প্রতিবছরের আষাঢ়ে দেশজুড়ে বৃক্ষমেলার আয়োজন করে সরকার। এবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি। ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মাসব্যাপী এ মেলা শুরু হয়েছে ৯ জুলাই। এবারের মেলায় ছাদবাগানে লাগানোর মতো আম, মাল্টা, পেয়ারা, অ্যাভোকাডোসহ ছোট আকারের ফলগাছ সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে। তবে মেলার শুরুতে ক্রেতা কম থাকলেও দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঝামাঝি বা শেষের দিকে বেচাকেনা বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃক্ষমেলায় বাহারি জাতের আমসহ ফলজ-বনজ গাছের স্টল দিয়েছেন জেএম ট্রপিক্যাল ফ্রুট পার্কের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জুয়েল আহমেদ চৌধুরী। তাদের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ১৪০০-১৫০০ প্রজাতির ফলগাছ। এর মধ্যে আমই প্রায় ৪০০ জাতের। মেলায় তারা ২০০টির বেশি আম ও দেড় শতাধিক প্রজাতির কমলা-মাল্টা চারা নিয়ে এসেছেন।
জুয়েল আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমান সময়ে ছাদবাগান বা ছোট পরিসরের বাগান শুধু দেশি ফলেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক ও উন্নত জাতের ফলগাছও অনেকেই লাগাচ্ছেন। এজন্য আমরা দেশীয় প্রজাতির পাশাপাশি বিদেশি গাছের প্রতি জোর দিচ্ছি। কেননা আমরা বাণিজ্যিক এসব জাত ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি, যেন দেশের মানুষও এ ধরনের ফলের চাষ করতে পারেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় উদ্ভাবিত রোজিগোল্ড, আর্লিগোল্ড, সানরাইজ, আগলি বেটি, টমি অ্যাটকিন্স, কেইট, অস্টিন, এঞ্জি, থাইল্যান্ডের ব্যানানা, ভারতের আলফানসো, কেসরসহ বহু বিদেশি আমের জাত রয়েছে। এসব আম দেশের জনপ্রিয় জাতের চেয়েও বেশি মিষ্টি। এমনকি বাণিজ্যিকভাবেও সম্ভাবনাময়। কিন্তু অনেকেই মনে করেন বিদেশি ফল মানেই স্বাদ কম। আসলে এ ধারণা সঠিক নয়।
তার মতে, আম ও কমলা-মাল্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো বাংলাদেশের আবহাওয়া। সঠিক জাত বাছাই ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে এসব ফল দেশের সব অঞ্চলে উৎপাদন করা সম্ভব। তবে ছাদবাগানের জন্য ডোয়ার্ফ বা সেমি-ডোয়ার্ফ জাতের গাছ নির্বাচন করতে হবে। যেসব লাগালে ছোট জায়গাতেই দীর্ঘদিন ধরে ফল খাওয়া যাবে। আর এসব গাছ সহজে নিয়ন্ত্রণেও রাখা যায়। বর্তমানে ছাদবাগান উপযোগী ছোট আকারের এ ধরনের গাছের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন জেএম ট্রপিক্যাল ফ্রুট পার্কের এই স্বত্বাধিকারী।
নিজের ছোট্ট বাগানে লাগাতে ‘কেইট’ জাতের একটি আমের চারা কিনেছেন হুমায়ুন মণ্ডল। আরও কয়েকটি চারা নিয়ে গাইবান্ধা ফিরবেন। তার মতে, আমগাছ পরিবেশের জন্য উপকারী। এজন্য বাগানে দেশি-বিদেশি উন্নত জাতের ফলগাছ লাগাতে চান। চারার দামও তার কাছে তুলনামূলক কম মনে হয়েছে।
বরিশালের বাসিন্দা হলেও ঢাকায় বসবাস করেন মির্জা আব্দুস সবুর। গ্রামে তার পাঁচ বিঘার একটি মিশ্র ফলবাগান রয়েছে। পাশাপাশি ছাদবাগানেও আমগাছসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেন। এর মধ্যে আম-মাল্টাও রয়েছে। বেল বা লিচুর মতো কিছু গাছ টবে ভালো হয় না মনে করেন তিনি।
আব্দুস সবুরের সঙ্গে কথা হয় জেএম ট্রপিক্যাল ফ্রুট পার্কের সামনে। জাতীয় বৃক্ষমেলায় তার পদচারণা এক যুগেরও বেশি। তুলনামূলক এবার চারার দাম কিছুটা কম বলে জানান তিনি। এই বৃক্ষপ্রেমী বলেন, মেলায় প্রথমবারের মতো এক ফুটের নিচে গ্রাফটিং করা আমের চারা দেখেছি। এ ধরনের কলম গাছ আকারে ছোট থাকায় অল্প জায়গায় বেশি লাগানো যায়। ফলনও ভালো হয়। এজন্য এমন কিছু চারা কিনে ছাদবাগানে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১২–১৫ বছর ধরে আমার বৃক্ষমেলায় আসা হয়। প্রতিবারই নতুন নতুন জাতের চারা কিনে নিজের গ্রামে থাকা বাগান ও ছাদবাগানে লাগানো হয়। এবারও কিছু বিদেশি ফলগাছের চারা নেব, ইনশা আল্লাহ। তার মতে, কর্মব্যস্ত নগরজীবনে প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন মানুষ। তাই শহরের বাসিন্দাদের ছাদবাগান বা ইনডোর প্ল্যান্টের মাধ্যমে সবুজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত।
আম, মাল্টা, পেয়ারা, সিজিয়াম, চায়না ডলসহ প্রায় ২০০ প্রজাতির ফলজ ও অন্যান্য গাছের চারা নিয়ে বৃক্ষমেলায় আলী জাহান এগ্রো। কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির মোহাম্মদ সেলিম নামের একজনের সঙ্গে। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, মেলা শুরুর প্রথম দুদিনে ৫০টির মতো চারা বিক্রি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে বীজবিহীন থাই পেয়ারার চারা, যা ছাদবাগানের জন্য উপযোগী। এছাড়া আমরা গাছ বিক্রির পাশাপাশি প্রতিটি চারার পরিচর্যা নিয়েও ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।
ছাদবাগান ও বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিতে বন বিভাগ জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার দিচ্ছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীরা যথাক্রমে ১ লাখ, ৭৫ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদ পাচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন নার্সারি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও ঋণসহ বিভিন্ন সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
সেলিম জানান, তাদের স্টলে বীজ-চারা দুটিই কেনা যাচ্ছে। সর্বনিম্ন ৩৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ কয়েক হাজার টাকা দামের চারাও রয়েছে এখানে। তবে এখন পর্যন্ত আসা ক্রেতাদের বেশির ভাগই ঢাকার বাসিন্দা। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষজন যোগাযোগ করলেও আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় আসতে পারছেন না। বৃষ্টিবাদল কমলে বেচাকেনা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সমাজবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, জাতীয় বৃক্ষমেলা শুধু চারা বিক্রির আয়োজন নয়, বরং বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার একটি উদ্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, নগর সবুজায়ন ও মানুষকে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তাই প্রতিবছরই মেলায় নতুন নতুন সংযোজন রাখা হয়। এছাড়া আমরা অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ একেক অঞ্চলের জন্য একেক ধরনের গাছ উপযোগী। একইসঙ্গে দেশীয় তাল, খেজুরসহ হারিয়ে যেতে বসা গাছ পুনরুদ্ধারেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগী বিদেশি ফলের চাষ বাড়ানো গেলে অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে বলে উল্লেখ করেন এই বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে অনেকেই ছাদবাগান বা কৃষিবাগানে বিভিন্ন দেশের ফল-ফলাজি গাছ লাগাচ্ছেন। এটি খুব ভালো দিক। কারণ আমরা নিজেরা ফল উৎপাদন করতে পারলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হবে। এছাড়া বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনায় দেশি-বিদেশি ফলগাছের চাষ বাড়ানো গেলে কৃষি ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, দ্রুত নগরায়নের কারণে শহরের সবুজ কমে যাওয়ায় ছাদবাগান এখন সময়ের দাবি। ছাদ ও বারান্দায় ফল, ভেষজ ও সবজি চাষ বাড়লে তাপমাত্রা কমাতে যেমন ভূমিকা রাখবে, তেমনি পারিবারিক পুষ্টি ও প্রাথমিক ভেষজ চাহিদাও পূরণ হবে। এ কারণে প্রতিবছর জাতীয় পর্যায়ে ছাদবাগানসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বৃক্ষরোপণে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করে বন বিভাগ। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের যথাক্রমে ১ লাখ, ৭৫ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা, ক্রেস্টসহ সনদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও ঋণসহ বিভিন্ন সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব কর্মসূচির ফলে বৃক্ষরোপণ ও ছাদবাগানে আগ্রহী হয়ে উঠছেন মানুষ।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, দ্রুত নগরায়নের ফলে শহরে সবুজ কমে যাচ্ছে এবং তাপমাত্রা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ছাদবাগান নগরের তাপমাত্রা কমানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বন বিভাগের এই কর্মকর্তা বলেন, দ্রুত নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শহরে সবুজের পরিমাণ দিন দিন কমছে। এর প্রভাব পড়ছে নগর পরিবেশেও। মানুষ, ভবন ও যানবাহন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে তাপমাত্রাও। ফলে ক্রমেই বসবাসের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকা। এমন পরিস্থিতিতে ছাদবাগান একটি কার্যকরী সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, নগরায়নের কারণে বেশিরভাগ খোলা জমিই হারিয়ে যাচ্ছে। এজন্য ভবনের ছাদে বাগান গড়ে তুলে একটি অংশ সবুজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে ছাদবাগান ও নার্সারিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। এ খাতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলেই টেকসই উন্নয়ন ও নগর সবুজায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জাতীয় বৃক্ষমেলায় ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯১টি চারা বিক্রি হয়েছিল। যার মূল্য ছিল ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ২৭৪ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল শোভাবর্ধনকারী ও ফলজ গাছ। গত বছরের বিক্রির রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
আগামী ৭ আগস্ট পর্যন্ত চলমান জাতীয় এ মেলা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। এখানে রয়েছে ১২০টি স্টল। এর মধ্যে ৪৭টি সিংগেল, ২২টি ডাবল ও ৯টি রয়েছে সরকারি।
মেলায় মা ও শিশু কর্নার, ব্রেস্টফিডিং সেন্টার, বয়স্কদের জন্য বিশ্রামকক্ষ, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ কয়েকটি নতুন সংযোজন রেখেছে বন বিভাগ।
এমআরআর/বিআরইউ
