জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে ‘জুলাই জাদুঘর’ পরিচালনার দায়িত্ব একটি নিরপেক্ষ ‘ট্রাস্টি বোর্ডের’ হাতে ন্যস্ত করার দাবি জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও যেন জাদুঘরের কন্টেন্ট বা ইতিহাসের বয়ান বদলে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা জরুরি।
রোববার (১২ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘জুলাই রেভুলেশন অ্যালায়েন্স’-এর আয়োজনে ‘অ্যাকাউন্টিবিলিটি, জাস্টিস অ্যান্ড হিলিং ইন পোস্ট জুলাই বাংলাদেশ’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে তিনি এ দাবি জানান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের সহযোগিতায় চললেও এর মালিকানা সরকারের নয়, বরং ট্রাস্টি বোর্ডের হাতে। জুলাই জাদুঘর কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতের প্রভাবমুক্ত রেখে প্রফেশনাল বা পেশাদার মানুষদের হাতে দেওয়া প্রয়োজন। সরকার বদল হলেই যেন কেউ এসে জুলাই জাদুঘরের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করতে না পারে বা ইতিহাস বিকৃত করার সুযোগ না পায়, সেজন্যই একটি শক্তিশালী ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা আবশ্যক।
ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কার বিষয়ে ফারুকী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার লড়াই। গত কয়েক দশকে আমাদের ইতিহাসকে সুকৌশলে একপাক্ষিক ও খণ্ডিত করে রাখা হয়েছিল, যা জাতিকে দীর্ঘসময় বিভ্রান্ত করেছে। জুলাই বিপ্লব সেই অর্গল খুলে দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ নিয়ে গবেষণা নয়, বরং ৫৪ বছরের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, শের-ই-বাংলাসহ জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায় নিয়ে কাজ করা।
জুলাইয়ের স্মৃতি ও দায়বদ্ধতা তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতার প্রশংসা করে ফারুকী বলেন, জুলাইয়ের বীরত্ব বাঙালিকে নতুন করে নিজেদের চিনতে শিখিয়েছে। মানুষকে শিকলে বাঁধার বড় অস্ত্র হলো বিস্মৃতি। আমরা আমাদের ইতিহাসের অনেক অধ্যায় ঢেকে রেখেছিলাম, কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাস পুনরুদ্ধারে সোচ্চার।
তিনি আরও বলেন, জুলাই জাদুঘর কেবল একটি প্রদর্শশালা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স বা বয়ান তৈরির অন্যতম শক্তি হতে পারে। জুলাইয়ের শহিদদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, শহিদদের মায়েরা ও এই তরুণ প্রজন্মই আগামীর বাংলাদেশ গড়ার মূল অনুপ্রেরণা।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শহিদুল আলম বলেন, যদি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি না বদলায়, তবে কেবল ওপরের মানুষগুলোকে বদলিয়ে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিগত ১৭ বছর ধরে ধরে যে অন্যায় হয়েছে, তার ফলে আমাদের আদালত, প্রশাসন ও পুলিশ ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার। অন্য সবকিছু মেরামত করা গেলেও, শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সময় লাগবে।
এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা ১৪ আসনের সাংসদ ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) বলেন, বর্তমান সরকারের সাড়ে পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ রয়েছে। যারা দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রগঠনের কথা ভাবেন, তারাই জুলাই সনদের গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন। বাংলাদেশের সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান ও মানুষের সম্ভাবনা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট, তবে এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন ও সঠিক দিকনির্দেশনা।
জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের ত্যাগ স্মরণ করে তিনি বলেন, সেই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না এবং একদিন জুলাই সনদ অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে সচেতন করতে জুলাই মিউজিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয় রক্ষায় প্রয়োজনে আবারও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন– সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল আলম, গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, শহীদ পরিবারসহ আরও অনেকে।
এমএল/বিআরইউ
